মতামত


বাংলাদেশের রাজনীতি, ট্যাগিং কালচার ও ঢাকা–৮–এর গুলিবর্ষণ: সহিংসতার রাজনীতি আর কতকাল?


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার

বাংলাদেশের রাজনীতি, ট্যাগিং কালচার ও ঢাকা–৮–এর গুলিবর্ষণ: সহিংসতার রাজনীতি আর কতকাল?
শাহারিয়া নয়ন:

বাংলাদেশের রাজনীতি এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নির্বাচন মানেই যেন আতঙ্ক, তীব্র উত্তেজনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো- বিশেষত ঢাকা–৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর ওপর সশস্ত্র হামলা আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, রাজনীতির নামে সহিংসতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে।

আজ শুক্রবার দুপুরে বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা ওসমান হাদীকে লক্ষ্য করে গুলি করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত ও দ্রুতগতির যেন একটি সুসংগঠিত বার্তা। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর গুরুতর অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে তাঁর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক।
এ ঘটনা শুধু একজন প্রার্থীর ওপর হামলা নয় এটি পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। 

বাংলাদেশের নির্বাচনী সহিংসতার একটি বড় কারণ হলো ট্যাগিং রাজনীতি যেখানে যাকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে হয়, তাকে আগে সামাজিকভাবে ট্যাগ করা হয় “ওরা আমাদের বিপক্ষে”, “ওরা শত্রু”, “ওরা অমুক দলের লোক”, “ওরা ষড়যন্ত্রকারী”, “ওরা বিদেশি এজেন্ট”

এই ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তিকে মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, যেন রাষ্ট্রবিরোধী হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। তখন হামলা, হুমকি বা দমন এসবকে দল সমর্থকরা “ন্যায়সংগত” বলে মনে করে।

 এভাবেই কথার লড়াই ধীরে ধীরে অস্ত্রের লড়াইয়ে রূপ নেয়। গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ থাকা স্বাভাবিক শত্রু বানানো নয়।

ওসমান হাদী স্বাধীন প্রার্থী ছিলেন, কোনো বড় দলের ব্যানারে না থেকেও নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় জনপ্রিয়তা অর্জন করছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছিলেন এসব কারণে তিনি সামাজিক–রাজনৈতিকভাবে “বিরক্তিকর” বা “অস্বস্তিকর” ট্যাগ পেয়েছেন। রাজনীতিতে যখন যুক্তির বদলে ট্যাগিং সংস্কৃতি প্রধান হয়ে ওঠে, তখন ব্যক্তির ওপর হামলা যেন নীরবে বৈধতা পায়।

প্রতিবারই আমরা দেখি একই দৃশ্য- গুলিবর্ষণ, আহত বা নিহতের খবর, পুলিশি বিবৃতি, সিসিটিভি বিশ্লেষণের আশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া, জনমনে ক্ষোভ, কিছুদিন পরেই ভুলে যাওয়া- এ চক্রের মধ্যে থেকে যায় ভুক্তভোগী পরিবার, ভয়ে থাকা সাধারণ মানুষ আর ক্ষতিগ্রস্ত গণতন্ত্র।

বিনা ভয়ে নির্বাচন করার অধিকার একটি মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার এখন যে কতটা ভঙ্গুর, ওসমান হাদীর ওপর হামলা আবারও তা প্রমাণ করে দিল। নির্বাচন যদি হয় ভয় আতঙ্কের মধ্যে, তাহলে ফল যাই হোক গণতন্ত্র নিশ্চিতভাবে দুর্বল হয়। স্বাধীন প্রার্থীদের ওপর হামলা হলে রাজনীতি আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, এবং ট্যাগিং নির্ভর বিভক্তি আরও গভীর হয়।

বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি চায় সহিংসতা নয়। তারা ভিন্নমতকে সম্মান করে গড়ে ওঠা রাজনীতি চায়, ট্যাগিং এবং দমন-পীড়নের রাজনীতি নয়। আজ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, কাল হয়তো অন্য কেউ হবে। এই চক্র থামাতে হলে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ সবাইকে বুঝতে হবে- গণতন্ত্রে অস্ত্রের স্থান নেই; যুক্তি, বিতর্ক ও সম্মানের জায়গাই রাজনীতির প্রকৃত ভিত্তি।

  • লেখক: শাহারিয়া নয়ন, সাংবাদিক / মতামত লেখকের নিজস্ব

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

রিয়েল এস্টেট সেক্টরে প্রয়োজন পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এই খাত প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেন হয়েছিল?

মাত্র দেড় বছর আগে সংঘটিত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তাক্ত আন্দোলন- যাকে অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দেন তা ঘিরে জনমনে নানা আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও এর পেছনের কারণগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন

সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর

মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।