মতামত


ট্রাম্প যতই চাক, ভেনেজুয়েলা কখনো পানামা হবে না


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:১৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার

ট্রাম্প যতই চাক, ভেনেজুয়েলা কখনো পানামা হবে না

আমেরিকার কোনো প্রেসিডেন্ট শেষবার যখন লাতিন আমেরিকার একজন ক্ষমতাধর শাসককে ধরে আনার জন্য সেনা পাঠিয়েছিলেন, তখন আমি ছিলাম একেবারে তরুণ সাংবাদিক। পৃথিবীর আরেক প্রান্তে বসে বড় পর্দার টেলিভিশনে ঝাপসা ছবিতে দেখছিলাম ‘অপারেশন জাস্ট কজ’। সেটা ছিল ১৯৮৯ সাল। পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের সেই অভিযানের পর গ্রেপ্তার হন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা, পরে যাঁর বিচার হয় মাদক পাচারের মামলায়। ওয়াশিংটনের চোখে আজও সেটি একটি ‘সফল’ বা আদর্শ সামরিক হস্তক্ষেপ।

 

এই অভিজ্ঞতার কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা-সংক্রান্ত সামরিক দুঃসাহসের সঙ্গে অনেকেই পানামার তুলনা টানছেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই। গল্পটাও প্রায় একই ছকে সাজানো একজন দুর্নীতিগ্রস্ত, মাদক-সংশ্লিষ্ট স্বৈরশাসক, নিখুঁত সামরিক অভিযান, তারপর তাঁকে ধরে এনে আমেরিকার আদালতের সামনে দাঁড় করানো।

 

শনিবার সকালে কারাকাসের আকাশে ধোঁয়া, অন্ধকার রাস্তায় আতঙ্কে ছুটে চলা মানুষ এই দৃশ্যকে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন ‘চমৎকার এক অভিযান’। গর্ব করে জানানো হয়েছে, মার্কিন সেনাদের সাহসিকতায় নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে দেশ থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এখানেই মূল ভুলটা। ভেনেজুয়েলা পানামা নয়।

 

ট্রাম্প প্রশাসন যদি ভাবে, ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর সাফল্য সহজেই নকল করা যাবে, তাহলে তাদের জন্য সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন বাস্তবতা। পার্থক্যটা শুরুই হয় ভৌগোলিক ও কৌশলগত বাস্তবতা থেকে।

 

১৯৮৯ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ যখন পানামায় হামলার নির্দেশ দেন, তখন সে দেশে আগে থেকেই ১০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল। দক্ষিণ কমান্ডের সদর দপ্তর ছিল পানামার মাটিতেই। আলাদা করে শক্তি প্রক্ষেপণের দরকার হয়নি। তারা প্রস্তুত ছিল সরকার উল্টে দিতে, গিলার্মো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসাতে এবং পানামা ডিফেন্স ফোর্সকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে।

 

ভেনেজুয়েলার চিত্র একেবারেই আলাদা। ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বা ইও জিমা অ্যামফিবিয়াস রেডি গ্রুপ যত শক্তিশালীই হোক, সেগুলো ভেনেজুয়েলার উপকূলের বাইরে ভাসছে দেশের ভেতরে নয়। আচমকা আঘাত করে একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সরানো সম্ভব হতে পারে। কিন্তু শুধু এতেই প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের একটি দেশ ‘চালানো’ যায় না।

 

আমি বহু বছর ইরাক যুদ্ধ কভার করে একটা জিনিস পরিষ্কারভাবে বুঝেছি স্বৈরশাসককে সরানোই সবচেয়ে সহজ ধাপ। আসল কঠিন কাজ শুরু হয় তার পর। আর সেই পরের ধাপটাই ঠিক করে দেয়, হস্তক্ষেপ সফল হবে নাকি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ।

 

এখানে আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে মাদুরোর পরে কে? পানামা ছিল ছোট একটি দেশ, যেটি কার্যত জন্মলগ্ন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ছায়ায় ছিল। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। এখানে একজন শক্তিশালী শাসক সরে গেলেই ক্ষমতা এমনিতেই বিরোধীদের হাতে চলে যাবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।

 

ভেনেজুয়েলার বলিভারিয়ান সশস্ত্র বাহিনী (ফ্যানবি) এখনো অক্ষত। এটি পানামা ডিফেন্স ফোর্সের মতো নয়। হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর আমলে এই বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে অভ্যুত্থানের ঝুঁকি কমে। কমান্ড কাঠামো খণ্ডিত, রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে ভেতরে ভেতরে প্রতিযোগিতা তৈরি করা হয়েছে। যাঁরা হুমকি হতে পারতেন, তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবৈধ অর্থনীতির মুনাফা দিয়ে বেসামরিক ক্ষমতা ও সামরিক নেতৃত্বের সম্পর্ক আরও শক্ত করা হয়েছে।

 

এই চিত্র নতুন নয়। ২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রশাসন হুয়ান গুইদোকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছিল এই আশায় যে, এতে শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে ভাঙন ধরবে। বাস্তবে তা হয়নি। সেনাবাহিনী ঐক্যবদ্ধই ছিল। শনিবারের অভিযানে এমন কিছু ঘটেনি, যা এই বাস্তবতা বদলে দিতে পারে।

 

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তেলের প্রশ্ন। পানামার ছিল খাল, ভেনেজুয়েলার আছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেলভান্ডার। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা আসলে এই সম্পদের দিকেই তাকিয়ে আছে। অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হবে।

 

এ কথাও ঠিক যে, মাদুরোর ক্ষমতায় থাকা নৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। প্রায় নিশ্চিতভাবেই তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে প্রকৃত অর্থে জয়ী হননি। তাঁর সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড ভয়াবহ। কিন্তু প্রশ্নটা সেটা নয়।

 

আসল প্রশ্ন হলো এই সামরিক অভিযান কি ভেনেজুয়েলার মানুষের জন্য সত্যিই ভালো কিছু বয়ে আনবে, নাকি দেশটিকে আরও গভীর বিশৃঙ্খলা, অনিশ্চয়তা আর সহিংসতার দিকে ঠেলে দেবে?

 

ইরাক থেকে শুরু করে আফগানিস্তান ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, স্বৈরশাসককে সরানো সহজ। কিন্তু তার পরের শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, সেই প্রশ্নের ভুল উত্তরই একটি দেশের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

 

ভেনেজুয়েলা কখনোই পানামা হবে না ট্রাম্প যতই সেটা বিশ্বাস করতে চান না কেন।

 

  • লেখক: ববি ঘোষ
    টাইম ম্যাগাজিনের সাবেক আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক
    টাইম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত
 
 

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”

কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?

‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা।

জেন-জির অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল, নির্বাচনে ফিরছে কি পুরোনো রাজনীতি

জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন–জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলি

ক্ষমতার ভারসাম্যনীতিঃ বাংলাদেশে আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের অসাম্য অবস্থান

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভ হলো ক্ষমতার ভারসাম্যনীতি। মন্টেস্কিয়ুর তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গ আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, কিন্তু একে অপরকে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যে রাখবে। এই নীতির উদ্দেশ্য