
তিনি ছিলেন সামান্য একজন টিনের ব্যবসায়ী। কিন্তু সততা, নিষ্ঠা আর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেছেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর মতো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। যা সাফল্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।বহু উদ্যোক্তা আর তরুণের মাঝে অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী এই ব্যক্তি এস এম নজরুল ইসলাম। যিনি ওয়ালটন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্পের পথিকৃৎ।জানা যায়, পারিবারিকভাবেই ব্যবসায়ী ছিলেন এসএম নজরুল ইসলাম। ব্রিটিশ আমলে তিনি কর্ণফুলি পেপার মিলের ঠিকাদারি কাজে লিপ্ত ছিলেন। এরপর দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা শুরু করেন। কর্মজীবনে সফল এ ব্যক্তি ১৯২৪ সালের ৭ মে, টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গোসাই জোয়াইর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম এস এম আতাহার আলী তালুকদার এবং মাতার নাম মোসাম্মৎ শামছুন নাহার। পাঁচ ছেলে আর দুই মেয়ের পিতা তিনি। যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন, সফলতা পেয়েছেন সেখানেই। সৎ, নিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন সর্ব মহলে।প্রথমে বাবা এস এম আতাহার আলী তালুকদারের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত হলেও স্বাধীনতার পর আলাদাভাবে ব্যবসা শুরু করেন নজরুল ইসলাম। ব্যবসা শুরুর প্রাথমিক অবস্থায় তিনি নানাবিধ প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। কিন্তু তার সততা ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে সব প্রতিকূলতা সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। দেশের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ইলেকট্রনিক্স পণ্যসামগ্রী পৌঁছে দিতে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রেজভী অ্যান্ড ব্রাদার্স’, সংক্ষেপে ‘আরবি গ্রুপ’। রেজভী তার বড় ছেলে। নজরুল ইসলাম তার ছেলেদের নিয়ে বৈঠক করে ব্র্যান্ডের নাম ঠিক করেন ওয়ালটন। পারিবারিক বৈঠকে আরেকটি নাম ঠিক হয় মার্সেল। তবে প্রথমে ওয়ালটন ব্র্যান্ডের নামেই যাত্রা শুরু হয়। আরবি গ্রুপ নাম বদলে হয়ে যায় ওয়ালটন গ্রুপ। যাতে বিশাল ভূমিকা রাখেন তার মেধাবী সন্তানরা। ২০০৬ সালে গাজীপুরের চন্দ্রায় জায়গা কিনে ওয়ালটনের নিজস্ব কারখানা নির্মাণের কাজে হাত দেওয়ার পর প্রথমে কিছু বাধার সম্মুখীন হতে হয়। তবে সেসব বাঁধা পেরিয়ে নিজেদের অর্থেই কারখানা নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়। ২০০৮ সালে নিজস্ব কারখানায় উৎপাদিত হয় ওয়ালটন ফ্রিজ। সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের পণ্য এবং সেবা দিয়ে জয় করে নেন গ্রাহকের আস্থা। পর্যায়ক্রমে শুরু হয় টেলিভিশন, মোটরসাইকেল এবং এয়ারকন্ডিশনার উৎপাদন প্ল্যান্ট। সবকিছুতেই ওয়ালটন পাইওনিয়ার। বর্তমানে বাংলাদেশে শিল্পায়নের মডেল হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা ওয়ালটন কারখানা পরিদর্শন করে মুগ্ধ হয়েছেন। ব্যবসায়িক সাফল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আলহাজ এসএম নজরুল ইসলাম বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি টাঙ্গাইল জেলা সমবায় ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, টাঙ্গাইল জেলা সার ডিলার সমিতির সভাপতি, টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের পরিচালক এবং টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় জমি বন্ধকি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি তার গ্রামে এসএম নজরুল ইসলাম কারিগরি বিদ্যালয় নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া, মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এতিমখানা’সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সাহায্য-সহযোগিতা দিতেন। মহৎপ্রাণ এই ব্যক্তি ২০১৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর রাতে না ফেরার দেশে চলে যান। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি প্রাণত্যাগ করেন। সে সময় তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। পরদিন ১৮ ডিসেম্বর, তার নিজ গ্রাম গোসাই জোয়াইরে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন। কিন্তু সুদূর প্রসারী চিন্তাশীল এই মানুষটির প্রতিষ্ঠিত ওয়ালটন এখন বিশ্বের কাছে শিল্পসমৃদ্ধ বাংলাদেশের ইতিবাচক ইমেজ তুলে ধরছে। বাংলাদেশও যে পারে, সেটি তিনি বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন।


