জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এর ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশটি এখন আইন হিসেবে কার্যকর হওয়ার পথে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১১ মে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। পরদিনই সেই অধ্যাদেশের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় এবং নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি দলটি।
বর্তমান বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশটিকেই সংসদে বিল আকারে পাস করেছে। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ও গেজেট প্রকাশের পর এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে পারবে। এমনকি সংশ্লিষ্ট সত্তার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, সভা-সমাবেশ বা বক্তব্য প্রদানও নিষিদ্ধ থাকবে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নতুন করে কোনো বিধান যুক্ত করা হয়নি; পূর্ববর্তী অধ্যাদেশটিকেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, “সরকার জনমতের প্রতিফলন হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখনও মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিদ্যমান। এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিক রাজনীতির সুযোগ দেওয়া হলে তা অনৈতিক হবে।”
তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক মনে করেন, “কোনো দলের সদস্য অপরাধ করলে তার বিচার হতে পারে, কিন্তু পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা ভবিষ্যতে রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ সরকারের সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, “যদি কোনো দল মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকে, তাহলে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।”
সংসদে বিলটি পাসের সময় এ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ চেয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, যদিও শেষ পর্যন্ত সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে তীব্র জনমত, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশল। কেউ কেউ মনে করছেন, শক্তিশালী বিরোধী দল অনুপস্থিত থাকলে বিএনপি তুলনামূলকভাবে স্বস্তিকর রাজনৈতিক পরিবেশে থাকতে পারবে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন একসময় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিরোধিতা করা বিএনপি এখন একই পথে হাঁটছে কি না। এ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমনে ব্যবহার হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অনেকে।










