ধর্ম
ইসলামি সভ্যতার বিকাশে পারস্য সাহিত্যের অবিস্মরণীয় অবদান
.jpg)
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামি সভ্যতা মূলত একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক সভ্যতা। আরব উপদ্বীপে ইসলামের আবির্ভাবের পর এ সভ্যতা ধীরে ধীরে বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে বিস্তার লাভ করে। এই বিকাশপ্রক্রিয়ায় আরবদের পাশাপাশি আজম (অনারব) জাতিগুলোর, বিশেষ করে পারসিক জাতির অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্বীকৃত।
ফারসি ভাষায় রচিত পারস্য সাহিত্য ইসলামি সভ্যতার চিন্তাধারা, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা ও সাংস্কৃতিক রুচিকে গভীরতা ও বহুমাত্রিকতা দান করেছে। এটি কেবল সাহিত্যিক ঐতিহ্য নয়; বরং ইসলামের সর্বজনীন বার্তাকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রকাশ ও সমৃদ্ধ করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিম বাহিনীর মাধ্যমে পারস্য অঞ্চল বিজয়ের পর প্রাচীন সাসানীয় সভ্যতার জ্ঞানভান্ডার, প্রশাসনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হয়। প্রাথমিকভাবে আরবি ভাষাই ধর্ম, রাষ্ট্র ও জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম ছিল।
তবে আব্বাসীয় খিলাফতের যুগে (৭৫০–১২৫৮ খ্রি.) পারস্য অঞ্চলের আলেম, কবি ও বুদ্ধিজীবীরা ইসলামি সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও প্রশাসনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে শুরু করেন। এই সময় থেকেই ফারসি ভাষা ইসলামি সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক বাহনে পরিণত হয়।
চতুর্দশ শতাব্দীর মহান ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর অমর গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা-তে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ইসলামি সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্যের পরিপক্বতা মূলত আজম জাতির বিশেষ করে পারসিকদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়েছে।
(ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১/২৬৫–২৮০)
তিনি লিখেছেন,
“আরবরা ইসলামের বাহক হলেও সভ্যতার পূর্ণ বিকাশে অনারবদের অবদান অপরিহার্য ছিল।”
আব্বাসীয় যুগ থেকে ফারসি ভাষা কেবল কাব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ইতিহাস রচনা, ওয়াজ-নসিহত, দর্শন ও আধ্যাত্মিক চিন্তার অন্যতম প্রধান বাহনে পরিণত হয়। দশম শতাব্দীর ঐতিহাসিক আল-মাসউদি তাঁর মুরুজ আল-যাহাব গ্রন্থে পারসিক জাতির সাহিত্যিক রুচি, ঐতিহাসিক চেতনা ও জ্ঞানানুশীলনের প্রশংসা করে দেখিয়েছেন, কীভাবে এই ঐতিহ্য ইসলামি সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
(আল-মাসউদি, মুরুজ আল-যাহাব, ২/১২৩–১৪৫)
নবম শতাব্দীর প্রখ্যাত সাহিত্যিক আল-জাহিজ তাঁর আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন-এ আরব ও আজম সাহিত্যের তুলনামূলক আলোচনায় স্বীকার করেছেন, ভাষার সৌন্দর্য, রূপক প্রয়োগ ও বর্ণনাশৈলীতে পারসিকদের দক্ষতা ইসলামি সাহিত্যের ভান্ডারকে উল্লেখযোগ্যভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
(আল-জাহিজ, আল-বায়ান ওয়াত-তাবয়িন, ১/৭৫–৯০)
পারস্য সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর নসিহতমূলক ও নৈতিক চরিত্র। ফারসি কাব্য ও গদ্যে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি ও সামাজিক ভারসাম্যের যে প্রতিফলন পাওয়া যায়, তা ইসলামি সমাজে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে।
চতুর্দশ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির তাঁর আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে আব্বাসীয় যুগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বর্ণনায় পারস্য অঞ্চলের সাহিত্যিক ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন।
(ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/১৪৮–১৬৫)
ইবনে খালদুনের মতে, যে জাতি জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চায় অগ্রগামী, সেই জাতিই সভ্যতার নেতৃত্ব দিতে সক্ষম।
(আল-মুকাদ্দিমা, ১/২৭৮)
এই বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও ভারসাম্যই পারস্য সাহিত্য ইসলামি সভ্যতাকে প্রদান করেছে। আধুনিককালের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আবুল হাসান আলী নাদভি (রহ.) বলেছেন, ইসলামি সভ্যতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিভিন্ন জাতির অবদান গ্রহণ ও সমন্বয় করার ক্ষমতা এ ক্ষেত্রে পারসিক জাতির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। (আবুল হাসান আলী নাদভি, মা যা খাসিরাল আলাম, পৃ. ৯৭–১১০)
পারস্য সাহিত্য ইসলামি সভ্যতার একটি অপরিহার্য উপাদান। এটি ইসলামি চিন্তাধারাকে আরও গভীর, সহনশীল ও সর্বজনীন করেছে। আরব ও আজম বিশেষ করে পারসিক জাতির সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়েই ইসলামি সভ্যতা তার পূর্ণতা ও পরিপক্বতা লাভ করেছে। পারস্য সাহিত্যের এই অবদান অনুধাবন করা মানে ইসলামি সভ্যতার বহুমাত্রিক ও সমন্বিত চরিত্রকে যথাযথভাবে বোঝা।
- ইফতেখারুল হক হাসনাইন, আলেম ও লেখক
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
ধর্ম থেকে আরও পড়ুন
রোজা রেখে যে ১০টি কাজ আমাদের বর্জন করা উচিত
রমজান মাস কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং নৈতিক শিক্ষার মাস। ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অর্জন করা, যা কোরআনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—
.jpg)
মাহে রমজান: শুধু রোজা নয়, এটি চরিত্র গঠনের মাস- আমরা কি চরিত্রও শুদ্ধ করছি?
রমজান কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বর্জনের মাস নয়। এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বোধ বৃদ্ধির মাস। ইসলামের শিক্ষায় রোজা কেবল খাদ্য-বর্জনের জন্য নয়, বরং মানুষের চরিত্র গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ইতিহাসে দ্বিতীয় রমজান: শাকহাবের প্রান্তরে মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ
৯১ হিজরির ১ রমজানে আন্দালুস বিজয়ের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ছয় শতক পর ৭০২ হিজরির ২ রমজানে সিরিয়ার মাটিতে রচিত হয় আরেক মহাকাব্যিক অধ্যায়। এদিন ‘শাকহাবের যুদ্ধ’ (১৩০৩ খ্রি.) কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নে এক চূড়ান্ত লড়াই।
.jpg)
ইফতার সামনে নিয়ে যে দোয়াগুলো পড়বেন
সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতার রোজাদারের জন্য এক বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, “রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ একটি যখন সে ইফতার করে, আরেকটি যখন সে তার প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।” (তিরমিজি, হাদিস: ৭৬৬)
.jpg)

.jpg)


.webp)

.jpg)

.jpg)