ধর্ম


ইতিহাসে দ্বিতীয় রমজান: শাকহাবের প্রান্তরে মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার

ইতিহাসে দ্বিতীয় রমজান: শাকহাবের প্রান্তরে মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ

ছবি: ফ্রিপিক


৯১ হিজরির ১ রমজানে আন্দালুস বিজয়ের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ছয় শতক পর ৭০২ হিজরির ২ রমজানে সিরিয়ার মাটিতে রচিত হয় আরেক মহাকাব্যিক অধ্যায়। এদিন ‘শাকহাবের যুদ্ধ’ (১৩০৩ খ্রি.) কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নে এক চূড়ান্ত লড়াই।

 

সপ্তম হিজরি শতকে পূর্ব দিক থেকে আসা মঙ্গোলীয় ঝড় তছনছ করে দেয় মুসলিম বিশ্বের বহু কেন্দ্র। ৬৫৮ হিজরির ২৫ রমজানে আইন জালুতের যুদ্ধ–এ সুলতান সাইফউদ্দিন কুতুজের নেতৃত্বে বড় বিজয় অর্জিত হলেও সিরিয়া–মিশর দখলের মঙ্গোল আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়নি।

 

সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ ইবনে কালাউন–এর শাসনামলে সংকট চূড়ান্ত রূপ নেয়। মঙ্গোল নেতা গাজান খান এক বিশাল বাহিনী পাঠান সেনাপতি কুতলুশাহর নেতৃত্বে। তারা হামা দখল করে দামেস্কের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। মুসলিম জাহান তখন অনিশ্চয়তার প্রান্তে।

 

এই যুদ্ধে আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব দেন আল্লামা তাকিউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া। তাঁর ভূমিকা ছিল তিন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ-

 

১. বিভ্রান্তি নিরসন: মঙ্গোলরা নিজেদের মুসলিম দাবি করায় কিছু সৈন্য দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। ইবনে তাইমিয়া ফতোয়া দেন ইসলামের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বৈধ।

 

২. মনোবল সঞ্চার: তিনি সৈন্যদের মাঝে ঘুরে আত্মবিশ্বাস জাগান। বিজয়ের বিষয়ে তাঁর দৃঢ় উচ্চারণ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

 

৩. সক্রিয় অংশগ্রহণ: যুদ্ধের শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রমজানে রোজা ভাঙা জায়েজ বলে তিনি নিজেই সামনে খাবার গ্রহণ করেন এবং দামেস্ক বাহিনীর পতাকাতলে অবস্থান নেন।

 

৭০২ হিজরির ২ রমজান, দামেস্কের দক্ষিণে শাকহাব প্রান্তরে দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদ; সঙ্গে ছিলেন আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাকফি বিল্লাহ।

 

যুদ্ধের শুরুতে মঙ্গোলরা প্রচণ্ড আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর ডানদিক ভেঙে দেয়। তবে সুলতানের অটল অবস্থান সৈন্যদের নতুন উদ্দীপনা জোগায়। সূর্যাস্তের পর মঙ্গোলরা পশ্চাদপসরণ করে; পরদিন পলায়নকালে তারা চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এই বিজয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মঙ্গোল আগ্রাসনের বড় হুমকি স্তিমিত হয়ে পড়ে।

 

২ রমজানের আলোচনায় আন্দালুসের স্মৃতিও ফিরে আসে। ১১৪ হিজরির ‘বালাতুশ শোহাদা’ যুদ্ধ যা ইউরোপে ট্যুরের যুদ্ধ নামে পরিচিত পশ্চিম ইউরোপে ইসলামের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেয়। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন, ওই যুদ্ধের প্রভাব বহু বছর স্থায়ী ছিল।

 

ফরাসি চিন্তক গুস্তাভ লে বন তাঁর গ্রন্থে আরব সভ্যতার বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি নিয়ে মন্তব্য করেন, যা ইউরোপীয় পুনর্জাগরণের পূর্বসূত্র হিসেবে বিবেচিত।

 

২ রমজানের অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা

  • ৬৫ হিজরি: আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান খেলাফতের বায়াত গ্রহণ করেন; প্রশাসনিক সংস্কার ও আরবি ভাষার দাপ্তরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।

  • ৫০ হিজরি: উকবা ইবনে নাফি উত্তর আফ্রিকায় কায়রোয়ান নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেন।

  • ৭৪ হিজরি: উত্তর আফ্রিকায় কার্থেজ বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাইজেন্টাইন প্রভাবের অবসান ঘটে।


সম্পর্কিত

ধর্মরমজানইতিহাস

জনপ্রিয়


ধর্ম থেকে আরও পড়ুন

আরাফাতের ময়দানে ১৬ লাখ হজযাত্রীর ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা

পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ‘ওকুফে আরাফাহ’ পালনে মঙ্গলবার ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৬ লাখের বেশি হজযাত্রী। মহান আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত লাভের আশায় তারা দিনভর ইবাদত, দোয়া ও জিকিরে মশগুল রয়েছেন। সৌদি প্রেস এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।

বজ্রপাতে পশু মারা গেলে কি কুরবানি আদায় হবে?

ঈদুল আজহাকে ঘিরে মুসলমানরা আগে থেকেই কুরবানির পশু কিনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে অনেক সময় বজ্রপাত, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পশু মারা যেতে পারে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— এমন অবস্থায় কি কুরবানি আদায় হবে, নাকি নতুন পশু কিনতে হবে?

কিয়ামতের জিজ্ঞাসাবাদ: বান্দার আমলই দেবে চূড়ান্ত সাক্ষ্য

কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাআলা কীভাবে বান্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন—এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা (রা.)। এই হাদিসে তুলে ধরা হয়েছে মানুষের আমল, জবাবদিহিতা এবং পরিণতির বাস্তবচিত্র।

ঈদের দিন কী করবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা আনন্দ, সম্প্রীতি ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। তবে এই আনন্দঘন দিনে ইসলামের নির্ধারিত কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে, যা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।