ধর্ম


রমজানে শয়তান বন্দি থাকলেও মানুষ পাপে জড়ায় কেনো?


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

রমজানে শয়তান বন্দি থাকলেও মানুষ পাপে জড়ায় কেনো?

ছবি: দূরবিন নিউজ


রমজান মাসে শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয় এ কথা একাধিক সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তবুও বাস্তবে দেখা যায়, রমজানেও অনেক মানুষ গুনাহে লিপ্ত হয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শয়তান বন্দি থাকলে পাপ সংঘটিত হয় কীভাবে?

 

হাদিসে যা এসেছে

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয়।

 

তিরমিজির এক বর্ণনায় রয়েছে, রমজানের প্রথম রাতেই শয়তান ও অবাধ্য জিনদের বন্দি করা হয়। তখন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেয়, “হে কল্যাণের অন্বেষণকারী, এগিয়ে আসো; হে অকল্যাণের পথচারী, থেমে যাও।” প্রতি রাতেই আল্লাহ তাআলা বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।

 

মুসনাদে আহমাদ ও নাসাঈর বর্ণনায় এসেছে, বিশেষ করে ‘মারাদাহ’ অর্থাৎ সবচেয়ে অবাধ্য ও শক্তিশালী শয়তানদের শিকলবন্দি করা হয়।

 

সব শয়তান, নাকি নির্দিষ্ট কিছু?

এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম ইবনে খুজাইমা উল্লেখ করেন, এখানে সব শয়তান নয়; বরং বিদ্রোহী ও শক্তিশালী শয়তানদের বোঝানো হয়েছে।

প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানি তাঁর ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে কয়েকটি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন

  • ইমাম হালিমির মতে, যারা আকাশের সংবাদ চুরি করত, মূলত তাদেরই শিকলবন্দি করা হয়, তাও রমজানের রাতগুলোতে।

  • আরেক দল আলেম বলেন, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত ও ইবাদতে ব্যস্ত থাকার কারণে মুমিনদের ওপর শয়তানের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

  • অনেকের মতে, কেবল ‘মারাদাহ’ বা সবচেয়ে অবাধ্য শয়তানরাই বন্দি হয়।

  •  

তবুও পাপ কেন ঘটে?

বিখ্যাত তাফসিরকার আল-কুরতুবি এ প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করেছেন 

 

প্রথমত: যারা প্রকৃত অর্থে শর্ত ও আদব মেনে রোজা রাখে, তাদের ক্ষেত্রে শয়তানের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। কিন্তু যারা শুধু না খেয়ে-না দেয়ে দিন পার করে, আত্মশুদ্ধির চেষ্টা করে না, তাদের ওপর এই সুরক্ষা পুরোপুরি কার্যকর নাও হতে পারে।

 

দ্বিতীয়ত: সব শয়তান বন্দি হয় না; কেবল শক্তিশালী ও অবাধ্য শয়তানদের বন্দি করা হয়।

 

তৃতীয়ত: গুনাহের উৎস কেবল শয়তান নয়। আরও কিছু কারণ রয়েছে

  • মানুষের নিজের নফস বা প্রবৃত্তি

  • দীর্ঘদিনের বদভ্যাস

  • মানুষরূপী শয়তান অর্থাৎ দুষ্ট লোকজন, যারা অন্যকে কুকর্মে প্ররোচিত করে

  •  

আক্ষরিক নাকি রূপক অর্থ?

এ বিষয়েও আলেমদের মধ্যে দুই ধরনের ব্যাখ্যা রয়েছে। কাজি ইয়াজসহ একদল আলেমের মতে, এটি আক্ষরিক অর্থেই ঘটে। আল্লাহ ফেরেশতাদের মাধ্যমে শয়তানের অনিষ্ট থেকে মানুষকে রক্ষা করেন।

 

অন্যদিকে ইবনে আবদুল বারসহ অনেক আলেম বলেন, এটি রূপক অর্থে বলা হয়েছে। অর্থাৎ রমজানে আল্লাহ মুমিনদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেন, ফলে শয়তানের প্রভাব কমে যায় এবং গুনাহের পথ কঠিন হয়ে পড়ে।

 

ইবনে আবদুল বার বলেন, শয়তানদের শিকলবন্দি করার অর্থ হলো আল্লাহ মুসলমানদের বড় ধরনের পাপ থেকে রক্ষা করেন এবং শয়তান সাধারণ সময়ের মতো সহজে তাদের প্রভাবিত করতে পারে না।

 

রমজানে শয়তানদের শিকলবন্দি করা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত সত্য। তা আক্ষরিক হোক বা রূপক উভয় ক্ষেত্রেই এর উদ্দেশ্য মানুষের জন্য নেকির পথ সহজ করা এবং গুনাহ থেকে বাঁচার সুযোগ বৃদ্ধি করা।

 

তবুও মানুষের নফস, অভ্যাস ও পরিবেশের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ হয় না। তাই আলেমদের মতে, রমজানকে কেবল রোজার মাস হিসেবে নয়; বরং আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে গ্রহণ করলে এই বিশেষ রহমতের পূর্ণ সুফল লাভ করা সম্ভব।


সম্পর্কিত

রমজানধর্মপাপ

জনপ্রিয়


ধর্ম থেকে আরও পড়ুন

আরাফাতের ময়দানে ১৬ লাখ হজযাত্রীর ক্ষমা ও রহমতের প্রার্থনা

পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা ‘ওকুফে আরাফাহ’ পালনে মঙ্গলবার ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়েছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ১৬ লাখের বেশি হজযাত্রী। মহান আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত লাভের আশায় তারা দিনভর ইবাদত, দোয়া ও জিকিরে মশগুল রয়েছেন। সৌদি প্রেস এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।

বজ্রপাতে পশু মারা গেলে কি কুরবানি আদায় হবে?

ঈদুল আজহাকে ঘিরে মুসলমানরা আগে থেকেই কুরবানির পশু কিনে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে অনেক সময় বজ্রপাত, দুর্ঘটনা, অসুস্থতা কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে পশু মারা যেতে পারে। তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— এমন অবস্থায় কি কুরবানি আদায় হবে, নাকি নতুন পশু কিনতে হবে?

কিয়ামতের জিজ্ঞাসাবাদ: বান্দার আমলই দেবে চূড়ান্ত সাক্ষ্য

কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাআলা কীভাবে বান্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবেন—এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন হযরত আবু হুরায়রা (রা.)। এই হাদিসে তুলে ধরা হয়েছে মানুষের আমল, জবাবদিহিতা এবং পরিণতির বাস্তবচিত্র।

ঈদের দিন কী করবেন, কী এড়িয়ে চলবেন

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা আনন্দ, সম্প্রীতি ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য উপলক্ষ। তবে এই আনন্দঘন দিনে ইসলামের নির্ধারিত কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় রয়েছে, যা মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।