বাংলাদেশ


ক্রিকেটার থেকে ‘শুটার’, চট্টগ্রামের অপরাধজগতে যেভাবে আলোচিত হয়ে উঠলেন ডেভিড ইমন


নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:৩০ জুলাই ২০২৬, ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

ক্রিকেটার থেকে ‘শুটার’, চট্টগ্রামের অপরাধজগতে যেভাবে আলোচিত হয়ে উঠলেন ডেভিড ইমন

ডেভিড ইমন । ছবি: সংগৃহীত


ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মাঠে অনুশীলন শুরু করেছিলেন। তবে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই পরিচয় ছাপিয়ে চট্টগ্রামের অপরাধজগতের আলোচিত নাম হয়ে ওঠেন মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বারবার উঠে আসে তার নাম।

 

পুলিশের ভাষ্য, বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’-এর অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বদানকারী ছিলেন ডেভিড ইমন। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর বুধবার ভারত পালানোর সময় যশোরের ঝিকরগাছা সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

 

গ্রেপ্তার হওয়া মোবারক হোসেন ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত ওমানপ্রবাসী মো. মুসার ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, স্কুলজীবন থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে অনুশীলনে যেতেন। পরে নগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নেন। চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে খেলেছেন এবং কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে অনুশীলন করেছেন।

 

পরিবার ও স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তার। ২০২০ সালে করোনা মহামারির পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। এ সময় চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।

 

এরপর ধীরে ধীরে অপরাধজগতে জড়িয়ে পড়েন ইমন। পুলিশ বলছে, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ শুটার ও ভাড়াটে খুনি হিসেবে পরিচিতি পান। ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রের মহড়া এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে বড় সাজ্জাদের হয়ে চট্টগ্রামজুড়ে অপরাধচক্র পরিচালনা করতেন তিনি।

 

পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রামে বড় সাজ্জাদের বাহিনীর মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। এই চক্রে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ভারত থেকে বড় সাজ্জাদ নিয়মিত তাদের নির্দেশনা দিতেন।

 

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা, হাটহাজারীর জোড়া খুন, চান্দগাঁওয়ে আফতাব হত্যা এবং চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একাধিক মামলা। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় মোটরসাইকেল ভাড়া করা এবং হামলায় অংশ নেওয়া সন্ত্রাসীদের সমন্বয়ের দায়িত্বও ইমনের ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

পুলিশের দাবি, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে তার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনার পর অস্ত্র ব্যবহারে তার দক্ষতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

 

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বায়েজিদ থানার একটি দস্যুতার মামলায় কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ইমন। তবে ২২ দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি পান। এরপর তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

 

এদিকে, বাকলিয়া থানার জোড়া খুনের মামলায় ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান ইমন। জামিন পাওয়ার পরপরই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। ওই ঘটনায় বিচারব্যবস্থা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

 

সম্প্রতি এক সাংবাদিককে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগেও আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন। চলতি বছরের ৯ মে বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিপ্লব দে পার্থের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে একটি অডিও বার্তাও পাঠানো হয়। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

 

বুধবার যশোর সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তারের পর ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বড় সাজ্জাদের অপরাধচক্র, অস্ত্র সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য সহযোগীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

 

পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান ও জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে ডেভিড ইমন যেন আর জামিনে মুক্ত হয়ে পালাতে না পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।


সম্পর্কিত

বাংলাদেশডেভিড ইমন

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

ময়মনসিংহে স্বামী হত্যা মামলায় দ্বিতীয় স্ত্রীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বহুল আলোচিত শফিকুল ইসলাম শপু হত্যা মামলায় তার দ্বিতীয় স্ত্রী আফরোজা শেখ ইতিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

রাষ্ট্রপতির পদে থাকার আগে বা পরে অভিযোগ থাকলে আইনি ব্যবস্থা সম্ভব: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা

রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আইনের মুখোমুখি না হলেও, দায়িত্ব গ্রহণের আগে বা দায়িত্ব ছাড়ার পর কোনো অভিযোগ থাকলে সেসব বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এ মন্তব্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং যেকোনো রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

অ্যাডভান্স নিয়েও ডেলিভারিতে টালবাহানা: প্রতারণা ও অপমানের অভিযোগ স্টার টেকের বিরুদ্ধে

দেশের প্রযুক্তিপণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান Star Tech & Engineering Ltd.-এর বিরুদ্ধে অগ্রিম অর্থ নেওয়ার পরও প্রি-অর্ডার করা ম্যাকবুক সরবরাহ না করা, পরে একই পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রির চেষ্টা এবং শোরুমে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠেছে।

টানা ১০ বছরেও লাভের মুখ দেখেনি ফুডপান্ডা বাংলাদেশ, লোকসান ১,৪০০ কোটি টাকার বেশি

বাংলাদেশের অনলাইন খাবার ও গ্রোসারি ডেলিভারি খাতে এক দশক ধরে কার্যক্রম চালালেও এখনো লাভের মুখ দেখেনি ফুডপান্ডা বাংলাদেশ। জার্মানির মূল প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি হিরোর আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফুডপান্ডার মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১১ মিলিয়ন ইউরো বা ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি।