বাংলাদেশ


নকল টাকা উদ্ধারের নাটক, পৌনে ৪ কোটি আসল টাকা খেয়ে ফেলল পুলিশ


নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার

নকল টাকা উদ্ধারের নাটক, পৌনে ৪ কোটি আসল টাকা খেয়ে ফেলল পুলিশ

ছবি: সংগৃহীত


রাজধানীর ওয়ারীতে কথিত জাল টাকা উদ্ধারের একটি অভিযানের আড়ালে প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে। অভিযানে জাল টাকা উদ্ধারের দাবি করা হলেও পুনঃতদন্তে উঠে এসেছে—বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল অঙ্কের আসল টাকা সরিয়ে রেখে পরিকল্পিতভাবে জাল টাকার নাটক সাজানো হয়েছিল।

 

ঘটনাটি গত বছরের ৮ নভেম্বর রাজধানীর ওয়ারীর জুড়িয়াটুলি এলাকার একটি বহুতল ভবনে সংঘটিত হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন ডিবির তেজগাঁও বিভাগের তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার (বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, রাঙামাটি) তারেক সেকান্দার

 

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৭ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার বাসিন্দা পুলিশের সোর্স দিদারুল আলম ঢাকায় একটি বাসায় বিপুল পরিমাণ টাকা থাকার তথ্য দেন। বিষয়টি একাধিক পুলিশ সদস্যের মাধ্যমে ডিবি তেজগাঁও বিভাগের কাছে পৌঁছায়। পরদিন ৮ নভেম্বর রাতেই অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বিপুল টাকার তথ্য পাওয়ার পরই তা আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হয়।

 

সোর্স দিদারুলের জবানবন্দি ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে জানা যায়, রাত সাড়ে ১১টার দিকে ডিবির একটি দল ওয়ারীর ৭ম তলার একটি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে। সেখানে দুই যুবককে আটক করা হয়।

 

তল্লাশির একপর্যায়ে একটি স্টিল ক্যাবিনেটের সাতটি ড্রয়ারে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা পাওয়া যায়—সবই ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের বান্ডিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় রুমের লাইট বন্ধ করে কয়েকটি ব্যাগে আসল টাকাগুলো ভরে নিচে পাঠানো হয়।

 

পরবর্তীতে পূর্বপ্রস্তুত জাল টাকা এনে একই স্থানে রাখা হয় এবং স্থানীয় কয়েকজনকে ডেকে এনে সাক্ষীর উপস্থিতিতে ‘জাল টাকা উদ্ধার’ দেখানো হয়। এরপর ৫-৬ লাখ জাল টাকা ও প্রায় ২০ লাখ নগদ টাকা উদ্ধারের দাবি করে মামলা দায়ের করা হয়।

 

৯ নভেম্বর ওয়ারী থানায় দায়ের করা মামলায় দুই ব্যক্তিকে জাল টাকা রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মামলার এজাহারে প্রায় ১৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং বিপুল জাল নোট উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু পরে তদন্তে দেখা যায়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে একাধিক ব্যক্তি ভারী ব্যাগ নিয়ে ভবন থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। অভিযানে থাকা কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোনের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) ও টাওয়ার লোকেশনও অভিযানের বর্ণনার সঙ্গে মিলছে না। অধিকাংশ সদস্যের ফোন অভিযানের সময় বন্ধ বা লোকেশনবিহীন ছিল।

 

ওই বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া টাকার মালিক হিসেবে নিজেকে পরিচয় দেন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মো. ফখরুদ্দীন। তিনি দাবি করেন, বাসায় ৩ কোটি ৭৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা ছিল। তিনি বলেন, আমি স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাসায় থাকা টাকাগুলো বৈধ ব্যবসার অর্থ। ডিবি আমার কর্মচারীদের জাল টাকার মামলায় ফাঁসিয়ে সব টাকা নিয়ে গেছে।

 

তিনি আরও জানান, দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও টাকা ফেরত পাননি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ দিলে পুনঃতদন্ত শুরু হয়।

 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অভিযানের পর সোর্সদের মধ্যে কয়েকজনকে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ দেওয়া হয়। তাদের মোবাইল বন্ধ করে আত্মগোপনে যেতে চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সোর্সের পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ঢাকায় এনে জোরপূর্বক অভিযোগে স্বাক্ষর করানোর ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে।

 

ঘটনার ৬-৭ দিনের মধ্যে ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অভিযানের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। পরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয় এবং আটক দুই ব্যক্তিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জাল টাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন।

 

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, বিষয়টি তদন্তাধীন। ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে সিটিটিসির যুগ্ম কমিশনার মুন্সি শাহাবুদ্দীনকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তরের কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

অভিযুক্ত কর্মকর্তা তারেক সেকান্দার বলেন, ইন্টারনাল তদন্ত চলছে। তদন্ত কমিটিই বর্তমান অবস্থা বলতে পারবে।

 

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এই ঘটনায়। পুনঃতদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।

 

 

 

 


জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

ত্যাগ ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে উদ্‌যাপিত হচ্ছে ঈদুল আজহা

সাম্য, ত্যাগ ও মানবিকতার শিক্ষা নিয়ে সারা দেশে উদ্‌যাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। বৃহস্পতিবার ১০ জিলহজ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঈদের জামাত, কোরবানি এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলনমেলায় মুখর হয়ে উঠেছে জনজীবন।

ওয়ালটন ফ্রিজ কিনে ১০ লাখ টাকা পেলেন ভোলার খোকন মিয়া

ওয়ালটনের ডিজিটাল ক্যাম্পেইন সিজন-২৪ এ ফ্রিজ কিনে ১০ লাখ টাকা পেয়েছেন ভোলার খোকন মিয়া। রোববার রাজধানীতে ওয়ালটন করপোরেট অফিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার হাতে পুরস্কারের চেক তুলে দেওয়া হয়।

কল্যাণপুরে চালু হলো ‘স্বপ্ন’র নতুন আউটলেট

রাজধানীর কল্যাণপুরে দেশের অন্যতম বৃহৎ রিটেইল চেইন শপ স্বপ্ন-এর নতুন আউটলেট চালু হয়েছে। সোমবার কল্যাণপুরের নাভানা গার্ডেন রোডে অবস্থিত সানমুন স্টার প্লাজা ভবনে প্রতিষ্ঠানটির ৯৩০তম আউটলেটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।

ভোলার আড়াই শ বছরের ঐতিহ্যবাহী পশুর হাট, নেই খাজনা-চাঁদা

ঈদুল আজহা সামনে রেখে ভোলাজুড়ে জমে উঠতে শুরু করেছে কোরবানির পশুর হাট। জেলার দেড় শতাধিক স্থায়ী ও অস্থায়ী পশুর হাটের মধ্যে ব্যতিক্রমী ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার গজারিয়া পশুর হাট। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মিয়া বাড়ির দরজার হাট’ নামেই বেশি পরিচিত।