ফিচার
মায়ের ত্যাগ, ছেলের স্বপ্ন: বই মজুরের জোছনা বিলাস

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের গুঞ্জন পাঠাগারে বইয়ের তাকের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠাতা স্বপন মিয়া । ছবি: সংগৃহীত
নূজহাত নাছিম:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত সুহাতা গ্রামে একটি পাঠাগার আজ অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের ঠিকানা। যে পাঠাগারের শুরু হয়েছিল মাত্র তিনটি বই দিয়ে, সেখানে এখন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার বই। এই দীর্ঘ পথচলার নেপথ্যে রয়েছেন স্বপন মিয়া, যিনি দারিদ্র্য, শ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে গড়ে তুলেছেন ‘গুঞ্জন পাঠাগার’।
স্বপনের শৈশব ছিল কঠিন সংগ্রামের। মাত্র দেড় বছর বয়সে তিনি বাবাকে হারান। সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মা রাজিয়া খাতুনের কাঁধে। তিন সন্তানকে মানুষ করতে তিনি মাটি কাটার কাজ করেছেন। বড় দুই ভাই রিকশা চালিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেছেন। অভাবের কারণে স্বপনকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নামার পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি।
ছেলের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে মা রাজিয়া খাতুন নিজের বসতভিটার সোয়া দুই শতাংশ জমি স্বপনের নামে লিখে দেন। পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে আট হাজার টাকা ঋণ নেন। সেই সামান্য পুঁজি আর তিনটি বই নিয়ে ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় গুঞ্জন পাঠাগার। পাঠাগারের মূল স্লোগান ছিল, ‘এসো বই পড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি।’
শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। পাঠাগার চালিয়ে রাখতে স্বপন কখনো ও কখনো দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন, আবার কখনো রিকশা চালিয়েছেন। নিজের শ্রমে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেছেন বই সংগ্রহে। দুই দশকেরও বেশি সময়ে সেই সংগ্রহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজার বইয়ে।
অভাবের মধ্যেও নিজের পড়াশোনা থামিয়ে দেননি তিনি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি কসবার বায়েক শাহ আলম কলেজে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একজন গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি, সাহিত্যিক, ছন্দকার, গীতিকার ও সুরকার। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২০টি।
সময়ের সঙ্গে টিনের একচালা ঘরের পাঠাগারটি এখন দুইতলা ভবনে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালে মায়ের মৃত্যু হলেও তাঁর স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠানকে আগের মতোই আগলে রেখেছেন স্বপন।
আজ গুঞ্জন পাঠাগার সুহাতা গ্রামের শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতি শুক্রবার সেখানে বইপাঠ, আলোচনা ও সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। পাঠাগার থেকে বই নিয়ে পড়াশোনা করে অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অনেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
নিজের এই উদ্যোগ সম্পর্কে স্বপন মিয়া বলেন, “আমার মতো অনেক ছেলে-মেয়ে অর্থের অভাবে বই কিনতে পারে না, পড়াশোনা মাঝপথে থেমে যায়। তাদের জন্যই গুঞ্জন পাঠাগার। আমি একদিন থাকব না, কিন্তু এই পাঠাগারটি যেন বেঁচে থাকে। কারণ এটি বন্ধ হয়ে গেলে গ্রামের অনেক শিশুর শেখার একটি বড় সুযোগ হারিয়ে যাবে।”
স্বপন মিয়ার গল্প মনে করিয়ে দেয়, সীমিত সামর্থ্য সব সময় স্বপ্নের সীমা নির্ধারণ করে না। একজন মানুষের নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা একটি গ্রামকে বদলে দিতে পারে। সুহাতার গুঞ্জন পাঠাগার সেই পরিবর্তনেরই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
ফিচার থেকে আরও পড়ুন
আমার ভোট, আমার ভবিষ্যৎ : ৪ শিক্ষার্থীর ৪ দৃষ্টিভঙ্গি
আর মাত্র একদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঠিক করার মুহূর্ত। আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো অংশীদার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বর্তমান শিক্ষার্থীরা।
.jpg)
শৈশবের রচনার স্বপ্ন থেকে রাজনীতির বাস্তব ময়দান
মানুষের সেবায় রাজনীতিতে তিন চিকিৎসক ছোটবেলায় আমরা যখন ‘Aim in Life’ রচনা লিখতাম, প্রায় সবাই একই কথা লিখতাম,বড় হয়ে ডাক্তার হব, গ্রামে ফিরে গিয়ে মানুষের সেবা করব। তখন সেটা ছিল কাগজে-কলমের স্বপ্ন।

ক্লাসরুমের বাইরে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখেন
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সকাল মানেই শুধু ক্লাসে ছুটে চলা শিক্ষার্থী বা করিডোরে শিক্ষকদের ব্যস্ত পায়ে হাঁটা নয়। সাতারকুল–বাড্ডা এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পাসে প্রতিটি সকাল শুরু হয় আরও আগে শহরের কোলাহল জেগে ওঠার আগেই। ক্লাসরুমে লেকচার শুরুর বহু আগে য
.webp)
মুক্তিযুদ্ধের অদম্য চেতনার প্রতীক: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি বাঙালি জাতির মুক্তিযুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও অদম্য সংগ্রামের এক জীবন্ত সাক্ষ্য। ২৩ ফুট উঁচু বেদির ওপর অস্ত্র হাতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন সংগ্রাম








