বাংলাদেশ
তিস্তা ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ: নিম্নমানের ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল

ছবি: দূরবিন নিউজ
কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে বাস্তবায়নাধীন একটি সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের জিও টেক্সটাইল ব্যাগ সরবরাহ ও ব্যবহারের অভিযোগে ৬ হাজার বালুভর্তি ব্যাগ বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট কারিগরি টাস্কফোর্স। এ ঘটনাকে ঘিরে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের খিতাব খাঁ এলাকায় তিস্তা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ব্যবহৃত জিও টেক্সটাইল ব্যাগের পুরুত্ব ন্যূনতম ৩ মিলিমিটার হওয়া বাধ্যতামূলক। তবে সরবরাহ করা কিছু ব্যাগে সেই মান বজায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রকল্পটির কার্যাদেশ একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া হলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পটির বাস্তব নিয়ন্ত্রণ ছিল একটি ছায়া ঠিকাদারি ব্যবস্থার হাতে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান প্রকল্পটির তদারকিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তার প্রভাবেই কাজটি পরিচালিত হচ্ছিল। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩০ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নদীতে ফেলার কাজ চলছিল।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী জিও ব্যাগ নদীতে ফেলার আগে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। তবে অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার আগেই কিছু ব্যাগ নদীতে ফেলা শুরু হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের টাস্কফোর্স প্রধান প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের জুন মাসে ঘটনাস্থলে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ৬ হাজার বালুভর্তি জিও ব্যাগ নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেনি। ফলে সেগুলো বাতিল ঘোষণা করা হয়। টাস্কফোর্সের সরেজমিন পরিদর্শনেও সরবরাহ করা ব্যাগের পুরুত্বে অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি প্রকল্পে নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহ করা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রমাণিত হলে কার্যাদেশ বাতিল, জরিমানা বা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করার বিধান রয়েছে।
এদিকে ব্যাগ বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে গত ৫ মার্চ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান দলীয় কয়েকজন নেতাকে সঙ্গে নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ে যান বলে অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান হাসিব, সদস্য কফিল উদ্দিন এবং পৌর বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুল আলীম।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের কাছে ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিলের কারণ জানতে চান। এ সময় প্রায় এক ঘণ্টা ধরে উত্তপ্ত তর্ক-বিতর্ক হয়। উপস্থিত কয়েকজনের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুড়িগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, টাস্কফোর্স সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী কাজের মান পরীক্ষা করেছে। নির্ধারিত ৩ মিলিমিটার পুরুত্ব না থাকায় ৬ হাজার জিও ব্যাগ বাতিল করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের চাপ বা প্রভাব গ্রহণ করা হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমানের বক্তব্য জানতে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য ও কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুর রহমান রানা বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত ঘটনা জানতে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে নদীভাঙন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে তা কার্যকর হবে না। এতে সরকারি অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন ও সম্পদ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক সূত্র জানায়, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারোডোব এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকটি ভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব প্রকল্পেও একই ঠিকাদারি গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে এবং এর সঙ্গে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমানের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে এলাকায় আলোচনা চলছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও প্রভাবের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা না হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
রিমার্কের ‘ডাবল লাখপতি’ ক্যাম্পেইন শুরু, দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ পুরস্কারের সুযোগ
হোমকেয়ার ও কসমেটিকস পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রিমার্ক এইচবি লিমিটেড ব্যবসায়িক অংশীদার ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী ‘ডাবল লাখপতি’ ক্যাম্পেইন আপনজন-০১ চালু করেছে। ৩ জুন থেকে শুরু হওয়া এই ক্যাম্পেইনের প্রথম ধাপ চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। ক্যাম্পেইনের আওতায় দেশের যেকোনো প্রান্তের তালিকাভুক্ত রিটেইলার বা বিক্রেতারা ন্যূনতম ২ হাজার টাকার রিমার্ক পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ পুরস্কার জয়ের সুযোগ পাবেন।

মুজিবুল হকের উত্থানের নেপথ্যে কী? ‘আমেরিকান ডাক্তার’ পরিচয়, চিকিৎসা সাম্রাজ্য ও বিতর্কের অনুসন্ধান
রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডির শুক্রাবাদে অবস্থিত “আমেরিকান ওয়েলনেস সেন্টার” নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্টেম সেল থেরাপি, অল্টারনেটিভ মেডিসিন এবং ফাংশনাল মেডিসিনের আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হিসেবে পরিচিত প্রফেসর ড. এম মুজিবুল হক নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে ‘আমেরিকান বোর্ড সার্টিফায়েড ডাক্তার’, ‘ফাইভ স্টার প্রফেসর’ এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রচার করে আসলেও, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তার পরিচয়, চিকিৎসা যোগ্যতা, স্টিমসেল ব্যবসা এবং রোগীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিস্ময়কর সব প্রতারণার তথ্য।
ইসলামী ব্যাংককে বাঁচাতে দ্রুত উদ্যোগ চাইলেন শফিকুর রহমান
জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর আস্থা কমে যেতে পারে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। একই সঙ্গে ব্যাংকটির প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কমছে না হামের প্রকোপ, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নের দাবি করলেও আক্রান্তের সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশু টিকার আওতায় আনা হলেও প্রতিদিন হাজারের বেশি শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।




