বাংলাদেশ


সাব-রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, আলোচনায় রমজান–মাইকেল চক্র


বিশেষ প্রতিনিধি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত:১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০২ অপরাহ্ন, রবিবার

সাব-রেজিস্ট্রার বদলি নিয়ে অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ, আলোচনায় রমজান–মাইকেল চক্র

ছবি: সংগৃহীত


সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে আসিফ নজরুলের শতকোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে যখন দেশ তোলপাড় তখন নেপথ্যে রমজান খান আর মাইকেল মহিউদ্দিনের চক্রের খোজ এসেছে ।

 

সরকার পতনের পর তাদের নেতৃত্ব ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নিজেদের সম্পদ বিবরনি জমা দেয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেন। এর পরে নির্বাচন না দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আধিপত্য বিস্তার করা রমজান কমিটি সিনিয়র সহসভাপতি থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধা ভুগি চক্রের সদস্য নিজের এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইকেল মহিউদ্দিনকে সামনে নিয়ে আসেন। কমিটির মেয়াদ পূরণের আগেই ১২ জানুয়ারি নতুন কমিটি ঘোষণা করেন তারা, যেখানে নামে মাত্র পুতুল সভাপতি করা হয় খন্দকার জামিলুর রহমানকে। যিনি চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আর সকল সাব রেজিস্ট্রারদের একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন করে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন নিজেই মহাসচিবের দায়িত্ব নেয়া মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ। বিগত সরকারের সময় নানা বিতর্কে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে সংবাদের শিরোনাম হওয়া মাইকেল।

 

বিগত সরকারের সময় লোভনীয় পদায়নে নিয়েছেন মাইকেল, ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, টঙ্গি, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের সব জায়গায়। সাব রেজিস্ট্রারদের ভাষায়, সেই পদায়ন নিতে অন্তত চার পাঁচ কোটি টাকা খরচ করতে হয়, যা অনায়াসেই লুফে নিয়েছেন মাইকেল। এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনের সময় নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নিয়মিত পত্রিকার শিরোনাম হলেও তাকে নড়াচরা করার সাহস হতো না কারও। কারণ যার সঙ্গে আছেন তৎকালীন বদলি সম্রাট বলে পরিচিত রমজান খান। সরকার পতনের পর পর আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে পরে শতকোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি করেন আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে। রমজান থেকে মাইকেলের হাতে সিন্ডিকেটের ক্ষমতা চলে গেলেও কাঠি নেড়েছেন রমজানই। যার ফলে নিজেও সুবিধা নিয়েছে রমজান।

 

তিনি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের সাব রেজিস্ট্রার থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদায়নের সময় বদলিতে সি গ্রেড অফিস পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও নিয়েছেন এ গ্রেডের পোস্টিং মুন্সিগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার । আর মুন্সিগঞ্জ সদরের সাব রেজিস্ট্রারের  দায়িত্বে থাকা মাইকেল নিয়েছেন ঢাকার লোভনীয় খিলগাঁওয়ের সাব রেজিস্ট্রার । মাইকেলকে দিয়ে সাব রেজিস্ট্রার বদলির নতুন সিন্ডিকেটের বস বনে যাওয়া রমজান নতুন কমিটিতে যাদের রেখেছেন, তাদের কাছ থেকে কমপক্ষে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা করে নিয়ে মাইকেলের হাতে তুলে দেন, যেই টাকার ভাগ চলে যায় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের হাতে। যার কারণে কমিটির সব সদস্যই তাদের পদায়নের পূর্ণ মেয়াদ তো দূরের কথা নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর থাকলে ১মাসের মাথায় নতুন পদায়ন নিতে দেখা যায়। এভাবেই চলতে থাকে আসিফ নজরুল-রমজান- মাইকেল চক্রের বদলি বাণিজ্য।

 

ঢাকার গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন নামিদামি হোটেলে চলতো বদলি বাণিজ্যের আলাপ চারিতা, দিন শেষে টাকার বড় ভাগ চলে যেত আসিফ নজরুলের পকেটে। সারা দেশের সাব রেজিস্ট্রারদের হর্তাকর্তা হয়ে উঠেন এই মাইকেল। এমনকি বদলির পরে জায়গা ধরে রাখতে নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয় মাইকেলকে। মাসিক ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা না দিলে পদায়ন টিকবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয় সাব রেজিস্টারদের; কয়েকজন সাব রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের অডিও রেকর্ড পাওয়া গেছে।

 

এছাড়া কমিটির যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা কমিটিতে প্রবেশ করেই চুয়াডাঙ্গা থেকে বদলি হয়ে চলে আসেন নারায়নগঞ্জের ফতুল্লায়, যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গির আলম শেরপুরে মাত্র কয়েক মাস থেকেই কমিটিতে পদ পাওয়া মাত্র দেশের সব থেকে লোভনীয় পোস্টিং বাড্ডায় বদলি হন। যেখানে বদলি হতে পাঁচ কোটি টাকার বেশি খরচ করতে হয়।

 

সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মিরোজ মানিকগঞ্জের শিংগার থেকে চলে আসেন ঢাকার কেরানিগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রার হয়ে। আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল বাতেন পূর্ণ মেয়াদ শেষ না করে ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে লোভনীয় পদায়ন নিয়ে যান গাজিপুর সদরের সাব রেজিস্ট্রার হয়ে। সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদনান নোমানও নিয়েছেন লোভনীয় বদলি, যুগ্ম সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. সাজ্জাদ হোসেন সি গ্রেটের পোস্টিং সিলেটের গোলাপগঞ্জ থেকে এ গ্রেডের পোস্টিং নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজারে আসেন। ক্রীড়া সম্পাদক খায়রুল বাসার তিন মাসে তিনবার বদলি হয়ে চলে আসেন আশুলিয়া ঢাকাতে। সেই পদায়নের পেছনে রয়েছে টাকার পাহাড়, প্রত্যেক জায়গায় বড় রকমের অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে নিজের পছন্দমতো বদলি নিয় নেন। প্রথমে টাঙ্গাইলের কালিহাতি থেকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া, কেন্দুয়া থেকে ঢাকার আশুলিয়ায়। দলিল স্বাক্ষর করার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা নেওয়ার বিরুদ্ধে দলিল লেখকরা বেশ কয়েকবার লিখিত অভিযোগ ও কয়েক দফা কলম বিরতির পরেও বহাল রয়েয়েন খায়রুল বাসার। অথচ খায়রুল বাসার আশুলিয়াতে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খালেদা বেগমের। আশুলিয়ায় থাকার জন্য বিপুল পরিমাণ টাকা দিতের রাজি না হওয়ায়, খালেদা বেগমের আশুলিয়ায় পদায়নের দুই মাসের মাথায় তাকে বদলি করে পাঠানো হয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে।

 

যুগ্ম সম্পাদক খিদমতের দায়িত্বে থাকা মো. জাহিদুর রহমান সি গ্রেডের পোস্টিং গাজিপুরের কালিগঞ্জ থেকে কক্সবাজার সদরের সাব রেজিস্ট্রার হন। এছাড়া কমিটির বাকি সদস্যরাও এই রমজান-মাইকেল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পেয়েছেন লোভনীয় পদায়ন। গোপন সূত্রে জানা যায়, এই চক্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গাজিপুর সদরের সাবরেজিস্ট্রার কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেনের মাধ্যমে সকল লেনদেনের কাজ সম্পাদন করেন।

 

এর আগে,  গত বুধবার দুদকের কার্যালয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন এ নিয়ে আবেদন দাখিল করেন।

 

ওই প্রতিবেদনের বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই ঘুস লেনদেন হয়েছে শতকোটি টাকা। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নীতিমালা মানা হয়নি। ঘুষের বিনিময়ে বদলির ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুত টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে কাউকে ছয়-সাত মাসের মধ্যে তিন-চার বার বদলি করা হয়েছে। আট মাসে (অক্টোবর-২৪ থেকে এপ্রিল-২৫ পর্যন্ত) নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি বাগিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে পছন্দের অফিসে বদলির আদেশ পেয়েছেন তারা। অতীতে কখনো মাত্র আট মাসে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।


বদলির নীতিমালা অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের অফিসে অনুরূপভাবে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়ন করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আট মাসে এই নীতিমালার তোয়াক্কা করা হয়নি।


সম্পর্কিত

বাংলাদেশঘুষ বাণিজ্যে

জনপ্রিয়


বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন

শেরপুরে বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা, উৎসবে মুখর গ্রামবাংলা

বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখকে ঘিরে শেরপুর জেলায় জমে উঠেছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা। প্রতিবছরের মতো এবারও জেলার শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রাম-গঞ্জজুড়ে বসছে এসব মেলা, যেখানে বাঙালিয়ানায় সেজে উঠেছে পুরো জনপদ।

আইসক্রিম প্রেমীদের জন্য সেভয়-এর নতুন চমক: বাজারে এলো 'ভ্যানিলা চকো ব্রাউনি উইথ ক্রিমি ক্যারামেল' ডিস্‌কোন

দেশের জনপ্রিয় আইসক্রিম ব্র্যান্ড সেভয় তাদের প্রিমিয়াম সেগমেন্ট ‘ডিস্‌কোন’-এ যুক্ত করল এক নতুন ও বৈচিত্র্যময় ভ্যারিয়েন্ট। কুকিজ, ব্রাউনি আর ক্রিমি ক্যারামেলের এক অনন্য মিশেলে বাজারে এসেছে ‘ভ্যানিলা চকো ব্রাউনি উইথ ক্রিমি ক্যারামেল’। রিচ ইনডালজিং স্বাদের এই আইসক্রিমটি প্রতি কামড়ে ভোক্তাদের দেবে এক রাজকীয় অভিজ্ঞতা।

বড়খাপন ইউনিয়নে পরিবর্তনের হাওয়া: চেয়ারম্যান পদে আলোচনায় কেফায়েত হোসেন কাঞ্চন

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশের মতো নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ৪ নম্বর বড়খাপন ইউনিয়নেও বইছে নির্বাচনী আমেজ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে চলছে আলোচনা, হিসাব-নিকাশ ও জনমত যাচাই।

দুর্গাপুরে ৭ বছরের শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, অভিযুক্ত নৈশপ্রহরী আটক

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার খুজিউড়া গ্রামে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে জঙ্গলে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শাহজাহান নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) বিকেল ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী বলে জানা গেছে।