অপরাধ
দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের পিআইও এনামুল হক, ১৩ বছরের রাম রাজত্ব

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এনামুল হকের দীর্ঘদিন একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নথি ও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে কয়েক দফায় ঘাটাইলে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। মাঝখানে অন্যত্র দায়িত্ব পালনের সময় বাদ দিলে একই উপজেলায় তাঁর মোট কর্মকাল প্রায় ১৩ বছর। বর্তমানে তিনি ২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর থেকে টানা ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার পাশাপাশি তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, নামসর্বস্ব ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখানো, সরকারি বরাদ্দ ভাগবাঁটোয়ারায় একটি কথিত সিন্ডিকেটকে সহায়তা এবং আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে এনামুল হকের বক্তব্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে এবং তিনি বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনামুল হক ২০১১ সালের ৭ আগস্ট কালিহাতী থেকে বদলি হয়ে ১৬ আগস্ট ঘাটাইলে যোগ দেন। প্রায় তিন বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে গোপালপুরে বদলি করা হয়। পরবর্তী সময়ে বগুড়ায় বদলির নির্দেশ হলেও তা স্থগিত হয়। এরপর ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি আবার ঘাটাইলে ফিরে আসেন। ঘাটাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সরকারি ওয়েবপোর্টালেও বর্তমানে তাঁকেই পিআইও হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে তাঁর যোগদানের তারিখ ১৫ নভেম্বর ২০১৬ উল্লেখ রয়েছে।
এনামুল হককে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে। বিভিন্ন সময়ে টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও কর্মসৃজন কর্মসূচির প্রকল্পে বাস্তবে কাজ না করে কাগজে-কলমে কাজ দেখানো, অস্তিত্বহীন প্রকল্পে বরাদ্দ এবং একই স্থানে একাধিকবার প্রকল্প দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের কাবিখা প্রকল্পে ২৩৯ দশমিক ৮৫৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগের কথাও উল্লেখ ছিল। তবে সে সময় এনামুল হক অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছিলেন, সব প্রকল্পেই কাজ হয়েছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঘাটাইলে কাবিখা প্রকল্পে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ও অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ ব্যবহারের অভিযোগ উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে একটি কথিত সিন্ডিকেটের মূলহোতা হিসেবে এনামুল হকের নাম উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্মসৃজন কর্মসূচি নিয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ঘাটাইলে কর্মসৃজন প্রকল্পে শ্রমিকদের কাজ না করিয়ে তাঁদের নামে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এমনকি শ্রমিকদের বিকাশ হিসাবের নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হাতে থাকার অভিযোগও ওঠে। ওই প্রতিবেদনে উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে পিআইও এনামুল হককে প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করা হলেও তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।
অভিযোগের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ নয় বলেও ২০২৫ সালের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ ও ২০১৯ সালে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের পর টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তদন্তে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে আসে এবং সরকারি অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়ায় পিআইওসহ সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে মোট ১ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া হয়। একই প্রতিবেদনে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের তৎপরতার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এই অর্থ ফেরত নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়া, তদন্তের নথি ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।
এনামুল হকের বিরুদ্ধে তাঁর সরকারি আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে ঘাটাইলের প্রধান সড়কে খাদ্যগুদামের বিপরীতে দোকানঘরসহ জমি কেনার অভিযোগের কথা বলা হয়। এ বিষয়ে জমির বিক্রেতার বক্তব্যও প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে এনামুল হক দাবি করেছেন, ওই সম্পত্তির অর্থের সঙ্গে অন্য একটি লেনদেনের সম্পর্ক রয়েছে এবং তিনি দোকান থেকে ভাড়া নিচ্ছেন। ফলে সম্পদ অর্জন নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে দলিল, অর্থের উৎস, আয়কর নথি ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন যাচাই জরুরি।
এর বাইরে ঘাটাইলের পাহাড়ি এলাকায় লাল মাটি কাটা ও বিক্রির একটি কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গেও এনামুল হকের যোগসাজশের অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত। স্থানীয়দের দাবি, বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজার ও বেকু দিয়ে পাহাড়ি মাটি কাটার কার্যক্রমে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে এসব কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে এই অভিযোগের ক্ষেত্রেও তাঁর সরাসরি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তরের বাইরেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম ঘিরে এনামুল হকের কথিত একটি প্রভাববলয় রয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস, ঘাটাইল খাদ্যগুদাম এবং সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে ঘুষ লেনদেনের কথিত সিন্ডিকেটের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশের অভিযোগও স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, বদলিযোগ্য একটি পদে একজন কর্মকর্তা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস-২০২৫-এর ৭(ক) বিধানের উল্লেখ করে বদলিযোগ্য কর্মকর্তার একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে কোনো কর্মকর্তা কতদিন একই কর্মস্থলে থাকবেন, তাঁকে বদলি করা হবে কি না—এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয়। তাই তাঁর দীর্ঘ কর্মকালকে সরাসরি ‘বিধি লঙ্ঘন’ হিসেবে চিহ্নিত না করে, সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী তাঁর অবস্থান ও বদলি-সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়াই যুক্তিসংগত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার ফলে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে একজন কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ব্যাহত হতে পারে। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের মতে, তদন্ত হলে শুধু অভিযোগের সত্যতা যাচাই নয়, বরং কোন প্রকল্পে কত টাকা বা খাদ্যশস্য বরাদ্দ হয়েছে, বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, প্রকল্পের মাস্টাররোল, বিল-ভাউচার, প্রকল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন, প্রকল্পের ছবি, ব্যাংক ও আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের তথ্যও যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার প্রশাসনিক কারণও খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দায়মুক্ত করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত হতে পারে।
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
ইয়াবা ব্যবসায়ী বাহারের সুদের জালে নিঃস্ব বহু পরিবার, মিথ্যা মামলা-হুমকির অভিযোগ
লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর পাগলা এলাকায় ইয়াবা ব্যবসা, উচ্চ সুদে অর্থ লেনদেন, ঋণগ্রহীতাদের হয়রানি এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। একাধিক বাসিন্দার দাবি, আর্থিক সংকটে পড়া মানুষ অনানুষ্ঠানিকভাবে ঋণ নিতে গিয়ে নানা ধরনের শর্তের মুখোমুখি হচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ঋণের বিপরীতে ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয় এবং পরে তা ব্যবহার করে মামলা করা হয়। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্তরা।

লক্ষ্মীপুরে ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার
লক্ষ্মীপুরে এক শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার (১৯ জুলাই) রাতে চন্দ্রগঞ্জ থানা পুলিশ ওই মাদ্রাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। সোমবার (২০ জুলাই) দুপুরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

১৫ বছর পর ধর্ষণ মামলার রায়: ৩ জনের আমৃত্যু কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন তিনজনের
ঠাকুরগাঁওয়ে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের প্রায় ১৫ বছর পর মামলার রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। রায়ে তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং অপর তিনজনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

কমিশন ছাড়া নড়ত না ফাইল, সওজ প্রকৌশলীর সিন্ডিকেটে জিম্মি পুরো ঠিকাদার মহল
সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুদকের অনুসন্ধান চললেও এখনো তাঁর কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।




