বিয়ে ইসলামে শুধু সামাজিক সম্পর্ক নয়, এটি একটি পবিত্র বন্ধন, দায়িত্ব এবং ইবাদত। বর্তমান সময়ে দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সমাজে নানা আলোচনা, বিতর্ক ও ভুল ধারণা রয়েছে। বিশেষ করে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে— প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা কি ইসলামে জায়েজ?

ইসলাম এই বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কুরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়টি বুঝলে দেখা যায়, ইসলাম একদিকে যেমন নির্দিষ্ট শর্তে একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার ও দায়িত্ব পালনের ওপর কঠোর গুরুত্ব আরোপ করেছে।

ইসলাম কি একাধিক বিয়ের অনুমতি দেয়?

ইসলামি শরিয়তে একজন মুসলিম পুরুষকে নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

citytouch 728-X-90

فَانْكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

অর্থাৎ,“তোমাদের কাছে নারীদের মধ্যে যারা ভালো লাগে, তাদের মধ্য থেকে দুই, তিন অথবা চারজনকে বিয়ে করো। কিন্তু যদি আশঙ্কা কর যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না— তবে একজনই যথেষ্ট।”— (সুরা আন-নিসা: ৩)

এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়, একাধিক বিয়ে ইসলামে বাধ্যতামূলক নয়; বরং এটি একটি অনুমতি, যা ন্যায়বিচারের শর্তের সঙ্গে জড়িত।

প্রথম স্ত্রীর অনুমতি কি বাধ্যতামূলক?

ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় বিয়ে করার জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ বা বিয়ের শর্ত নয়। অর্থাৎ, বিয়ের মৌলিক শর্ত— ইজাব-কবুল, সাক্ষী ও মোহরানা পূরণ হলে অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়েও শরিয়ত অনুযায়ী বৈধ হবে।

তবে এখানেই ইসলামের শিক্ষা শেষ নয়। ইসলাম শুধু বৈধতা নয়, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও ন্যায়বিচারও শিক্ষা দেয়।

ন্যায়বিচারই সবচেয়ে বড় শর্ত

একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ন্যায়বিচার। ভরণপোষণ, সময়, আচরণ, সম্মান ও দায়িত্ব— সব ক্ষেত্রেই সমতা বজায় রাখতে হবে।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে আরও ইরশাদ করেন—

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ

অর্থাৎ,“তোমরা যতই চেষ্টা করো না কেন, স্ত্রীদের মধ্যে পুরোপুরি ন্যায়বিচার করতে কখনোই সক্ষম হবে না।”— (সুরা আন-নিসা: ১২৯)

এই আয়াত মানুষকে সতর্ক করে দেয় যে, একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করা অত্যন্ত কঠিন দায়িত্ব।

আলেমদের মতামত কী?

রাজধানীর আফতাবনগরের আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া ইদারাতুল উলূম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল মুফতি মোহাম্মদ আলীর মতে, শরয়ি প্রয়োজন দেখা দিলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, যদি প্রথম স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হন, স্বামীর হক আদায়ে অক্ষম হন, অথবা এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে স্বামীর গুনাহে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে— তখন একজন আলেমের পরামর্শ নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রথম স্ত্রীর কোনো সমস্যা না থাকলে শুধু ইচ্ছার বশে দ্বিতীয় বিয়ে করতে গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারে অশান্তি ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়, যা ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।

গোপনে দ্বিতীয় বিয়ে কি বৈধ?

গোপনে বিয়ে তখনই অবৈধ হবে, যদি বিয়ের মৌলিক শর্ত পূরণ না হয়। তবে বাস্তব জীবনে গোপন বিয়ে প্রায়ই পারিবারিক ভাঙন, অবিচার ও সম্পর্কের সংকট তৈরি করে। তাই ইসলাম এমন আচরণকে উৎসাহিত করে না।

স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তম আচরণের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন—

“তোমাদের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম।”— (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪১৭৬)

আরেক হাদিসে এসেছে—

“নারীদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।”— (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫১৮৬)

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, যদিও অনুমতি নেওয়া ফরজ নয়, তবুও প্রথম স্ত্রীর অনুভূতি, অধিকার ও মানসিক অবস্থার প্রতি সম্মান দেখানো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

ইসলামের মূল শিক্ষা কী?

ইসলাম দ্বিতীয় বিয়েকে কেবল বৈধতার বিষয় হিসেবে দেখেনি। বরং সেখানে ন্যায়বিচার, দায়িত্ব, সামর্থ্য ও মানবিকতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

যে ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ের চিন্তা করবেন, তার উচিত—

নিজের সামর্থ্য যাচাই করা

উভয় স্ত্রীর হক আদায়ে সক্ষম হওয়া

পারিবারিক শান্তি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা

আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার বিষয়টি স্মরণ রাখা

কারণ ইসলাম শুধু বিয়ে বৈধ কি না, সেটাই দেখে না; বরং মানুষ তার দায়িত্ব কতটা ন্যায় ও সততার সঙ্গে পালন করছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে।