ফিচার


বিশ্ব চাকরির বাজারে এআইয়ের ঝড়ে কোন পেশা হারাবে, কোন দক্ষতার কদর বাড়বে?


ডেস্ক রিপোর্টার

জান্নাতুল ফেরদৌসী

প্রকাশিত:২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার

আপডেট:২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪০ পূর্বাহ্ন, বুধবার

বিশ্ব চাকরির বাজারে এআইয়ের ঝড়ে কোন পেশা হারাবে, কোন দক্ষতার কদর বাড়বে?

মাত্র দুই বছর আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অনেকের কাছেই ছিল ভবিষ্যতের প্রযুক্তি। অথচ আজ সেই প্রযুক্তিই বিশ্বের চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যাংক, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিপণন, এমনকি আইন পেশাতেও দ্রুত বিস্তার ঘটছে এআইয়ের। একদিকে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর আসছে, অন্যদিকে এআই দক্ষ কর্মীদের চাহিদা ও বেতন বাড়ছে রেকর্ড হারে। ফলে নতুন বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এআই কি সত্যিই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি বদলে দেবে পুরো কর্মসংস্থানের চিত্র?

 

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন চাকরি সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হবে অথবা কাজের ধরন আমূল বদলে যাবে। অর্থাৎ চাকরি কমে যাচ্ছে না, বরং বদলে যাচ্ছে কাজের ধরন। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিক্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, ভবিষ্যতের কর্মবাজারে তারাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবেন।

 

ইতোমধ্যেই বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান ডেটা এন্ট্রি, গ্রাহকসেবা, অনুবাদ, হিসাবরক্ষণ, প্রশাসনিক কাজ, প্রাথমিক কনটেন্ট তৈরি এবং সাধারণ সফটওয়্যার কোডিংয়ের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ এআইয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এখন গ্রাহকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে চ্যাটবট, প্রতিবেদন তৈরি করছে এআইভিত্তিক সফটওয়্যার, এমনকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই জটিল তথ্য বিশ্লেষণও করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ফলে যেসব পেশায় একই ধরনের কাজ বারবার করতে হয়, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

 

তবে এআইকে শুধু চাকরি হারানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একই সঙ্গে এটি তৈরি করছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে দ্রুত চাহিদা বাড়ছে এআই ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, ডেটা সায়েন্টিস্ট, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক, ক্লাউড কম্পিউটিং বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার ডেভেলপার, রোবোটিক্স প্রকৌশলী এবং ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞদের। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বায়োটেকনোলজি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি খাতেও দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। শুধু প্রযুক্তিগত জ্ঞানই নয়, বিশ্লেষণী চিন্তা, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতাকেও ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে নয়। দেশের হাজারো তরুণ এখন আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস, দূরবর্তী (রিমোট) চাকরি এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দিয়ে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। এআই টুল ব্যবহারের দক্ষতা, ইংরেজিতে সাবলীল যোগাযোগ, ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল দক্ষতা এবং দ্রুত নতুন প্রযুক্তি শেখার মানসিকতাই আগামী দিনের কর্মবাজারে সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।

 

অনেকের আশঙ্কা, এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন চিত্র দেখায়। শিল্পবিপ্লবের সময়ও এমন আশঙ্কা ছিল, কম্পিউটার আসার সময়ও একই প্রশ্ন উঠেছিল। বাস্তবে অনেক পুরোনো পেশা হারিয়ে গেলেও নতুন প্রযুক্তি নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি মানুষের বিকল্প হওয়ার চেয়ে মানুষের সক্ষমতা বাড়ানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে দ্রুত প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।

 

তবে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আগামী কয়েক বছরে চাকরির বাজারে সবচেয়ে বড় বিভাজন হবে প্রযুক্তি জানা, আর প্রযুক্তি না-জানা মানুষের মধ্যে। যারা এআইকে ভয় পেয়ে দূরে সরিয়ে রাখবেন, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন। আর যারা এআইকে নিজের দক্ষতার অংশ বানাতে পারবেন, তাদের জন্য খুলে যেতে পারে বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।

 

বিশ্বের কর্মবাজার এখন ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্নটি আর এআই চাকরি নেবে কি না, সেটি নয়। আসল প্রশ্ন হলো আপনার বর্তমান দক্ষতা কি আগামী দশ বছরের চাকরির বাজারেও সমান মূল্যবান থাকবে, নাকি এখনই নিজেকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত করার সময় এসে গেছে?




সম্পর্কিত

ফিচার

জনপ্রিয়


ফিচার থেকে আরও পড়ুন

মায়ের ত্যাগ, ছেলের স্বপ্ন: বই মজুরের জোছনা বিলাস

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রত্যন্ত সুহাতা গ্রামে একটি পাঠাগার আজ অনেক তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের ঠিকানা। যে পাঠাগারের শুরু হয়েছিল মাত্র তিনটি বই দিয়ে, সেখানে এখন রয়েছে প্রায় ১৫ হাজার বই। এই দীর্ঘ পথচলার নেপথ্যে রয়েছেন স্বপন মিয়া, যিনি দারিদ্র্য, শ্রম আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে গড়ে তুলেছেন ‘গুঞ্জন পাঠাগার’।

আমার ভোট, আমার ভবিষ্যৎ : ৪ শিক্ষার্থীর ৪ দৃষ্টিভঙ্গি

আর মাত্র একদিন পরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন মানেই শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, এটি একটি দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা ঠিক করার মুহূর্ত। আর সেই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো অংশীদার তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে বর্তমান শিক্ষার্থীরা।

শৈশবের রচনার স্বপ্ন থেকে রাজনীতির বাস্তব ময়দান

মানুষের সেবায় রাজনীতিতে তিন চিকিৎসক ছোটবেলায় আমরা যখন ‘Aim in Life’ রচনা লিখতাম, প্রায় সবাই একই কথা লিখতাম,বড় হয়ে ডাক্তার হব, গ্রামে ফিরে গিয়ে মানুষের সেবা করব। তখন সেটা ছিল কাগজে-কলমের স্বপ্ন।

ক্লাসরুমের বাইরে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচিয়ে রাখেন

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সকাল মানেই শুধু ক্লাসে ছুটে চলা শিক্ষার্থী বা করিডোরে শিক্ষকদের ব্যস্ত পায়ে হাঁটা নয়। সাতারকুল–বাড্ডা এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পাসে প্রতিটি সকাল শুরু হয় আরও আগে শহরের কোলাহল জেগে ওঠার আগেই। ক্লাসরুমে লেকচার শুরুর বহু আগে য