লাইফস্টাইল


এ শহরের কাকেরা গেল কোথায়?


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার

এ শহরের কাকেরা গেল কোথায়?

এক সময় ভোরের শহর মানেই ছিল কাকের ডাক। চোখ খুলতেই কানে আসত সেই চেনা ‘কা… কা… কা…’। আবার দুপুরে কাকডাকা দুপুর রোদে ঝিম ধরা শহর, আধখোলা জানালা, ঘুম আসে-যায়; ঠিক তখনই কাকের ডাক। বিরক্তিকর ছিল, তবু না থাকলে যেন কিছু একটা কম লাগত। আজ সেই ডাক আর শোনা যায় না। তাই প্রশ্নটা নিজের অজান্তেই উঠে আসে এই শহরের কাকেরা কোথায় গেল?

 

কাক ছিল শহরের সবচেয়ে আপন পাখি। ছাদের কার্নিশ, বৈদ্যুতিক তার, ডাস্টবিনের পাশে সবখানেই তাদের অবাধ যাতায়াত। তারা ছিল নগরের অঘোষিত সাফাইকর্মী। মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারেই চলত তাদের জীবন। শহরের সঙ্গে তাদের সহাবস্থান ছিল স্বাভাবিক, নির্ভার। কেউ ভাত ফেললে কাক হাজির, কাপড় শুকোতে দিলে সাবধান তবু কারও রাগ হতো না। তারা ছিল আমাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।

 

স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ে। ভোরে মায়ের ডাক ‘ওঠ, দেরি হবে।’ উঠেই কাকের ডাক। মনে হতো, ওরাও বুঝি আমাদের মতোই কাজে বেরিয়েছে। কলোনির ছাদগুলো ছিল তাদের স্থায়ী ঠিকানা। দুপুরে দিদিমার গল্প, স্কুলব্যাগ ছুড়ে ফেলার আনন্দ, ঘুম ভাঙানোর সেই কর্কশ ডাক সব মিলিয়ে কাক ছিল শৈশবের পটভূমির সংগীত।

 

এখনো দুপুর আসে, যায়। জানালা খুললে শোনা যায় এসির গুঞ্জন, গাড়ির হর্ন। কিন্তু কাকের ডাক নেই। গ্রীষ্মের ছুটিও আর আগের মতো লাগে না। মোবাইলের স্ক্রিনে সময় কেটে যায়, অলস দুপুরের সুযোগই মেলে না। আর ঘুম ভাঙানোর জন্য কেউ ডাকেও না।

 

কাকেরা কি শুধু পাখি ছিল? নাকি তারা ছিল সময়ের চিহ্ন অলসতার সঙ্গী, ছুটির দিনের শব্দ, শহরের স্মৃতি? তাদের ডাকের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মায়ের বকুনি, দিদিমার আদর, ছোটবেলার নির্ভার দিনগুলো।

 

শহর বদলেছে। একতলা-দোতলার জায়গায় উঠেছে বহুতল। কার্নিশ সরু, ছাদে খোলা জায়গা কম। বট-অশ্বত্থ কেটে গেছে পার্কিং আর ফ্লাইওভারের নিচে। গাছ মানেই তো পাখির ঘর। গাছ কমলে বাসা কমে, ডিম পাড়ার জায়গা কমে কাকেরাও সরে যায়।

 

খাবারের সংকটও বড় কারণ। ‘ক্লিন সিটি’ অভিযান ঢাকনাওয়ালা ডাস্টবিন, আবর্জনা আলাদা করে সংগ্রহ স্বাস্থ্যকর, প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর অপ্রত্যাশিত ফল হলো কাকের মতো স্ক্যাভেঞ্জার পাখিদের খাদ্য হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া। মানুষের শহরই ছিল তাদের ভরসা; সেই শহরই তাদের মুখ ফিরিয়ে নিল।

 

তার ওপর শব্দদূষণ। সারাক্ষণ হর্ন, নির্মাণকাজ, জেনারেটরের আওয়াজ। কাক সামাজিক পাখি ডাকাডাকি তাদের যোগাযোগ। শহরের কোলাহলে সেই যোগাযোগ ভেঙে যায়। ধীরে ধীরে তারা এমন জায়গায় সরে যায়, যেখানে নিজেদের ডাক শোনা যায়।

 

কাকের অনুপস্থিতি শুধু নস্টালজিয়ার বিষয় নয়, এটা পরিবেশগত সতর্কবার্তা। কোনো বাস্তুতন্ত্রে স্ক্যাভেঞ্জার কমে যাওয়া মানে ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। শহর হয়তো চকচকে হয়েছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি আরও অসুস্থ হয়ে ওঠেনি?

 

তবু আশা আছে। ছাদবাগান, নগর বনায়ন, বিষমুক্ত পরিবেশ এসব ফিরলে পাখিরাও ফিরতে পারে। কাক খুব সহজে মানিয়ে নেয়, যদি আমরা তাদের জন্য একটু জায়গা রাখি। হয়তো একদিন ভোরের শহরে আবার শোনা যাবে সেই পরিচিত ডাক। তখন প্রশ্নটা বদলে যাবে এই শহরের কাকেরা ফিরল কীভাবে?

 

মাঝে মাঝে খুব ভোরে বা ভরদুপুরে দূরে কোথাও ক্ষীণ একটা ডাক কানে আসে। মনে হয়, ভুল শুনলাম? নাকি সত্যিই কেউ আছে? তখন বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার ওঠে। প্রশ্নটা আবার ফিরে আসে এই শহরের কাকেরা কোথায় গেল? নাকি তারা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সেই পুরোনো দিনগুলোও নিয়ে গেল?

 

  •  লেখক: নাদিয়া রহমান
 

সম্পর্কিত

কাকলাইফস্টাইল

জনপ্রিয়


লাইফস্টাইল থেকে আরও পড়ুন

নাদিয়া আফরোজের প্রশিক্ষণে সুপার অ্যাডভান্সড মেকআপ মাস্টার ক্লাস ১৮ আগস্ট

মেকআপ শিল্পে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিউটি উদ্যোক্তা হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের জন্য একদিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করেছে ফ্যান্সী বিউটি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড টেকনোলজি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেকআপ আর্টিস্ট নাদিয়া আফরোজের প্রশিক্ষণে আগামী ১৮ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত হবে ‘একদিনের এক্সক্লুসিভ সুপার অ্যাডভান্সড মেকআপ মাস্টার ক্লাস’।

অ্যালোভেরার পুষ্টিতে ত্বকের যত্নে নতুন আস্থা, বাজারে ফ্যান্সী স্কিন ক্রিম

ব্যস্ত জীবনযাত্রা, ধুলাবালি ও পরিবেশদূষণের কারণে ত্বকের উজ্জ্বলতা ও সজীবতা ধরে রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজারে এসেছে প্রিমিয়াম মানের ফ্যান্সী অ্যালোভেরা স্কিন ক্রিম, যা ত্বকের গভীরে পুষ্টি পৌঁছে দিয়ে ত্বককে সতেজ ও কোমল রাখতে সহায়তা করে বলে জানিয়েছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান।

আধুনিক স্বাদে দেশি টুইস্ট, কেএফসি নিয়ে এলো 'কারি ক্রাঞ্চ'

বৈশ্বিক ফাস্টফুড ব্র্যান্ড কেএফসির বাংলাদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি ট্রান্সকম ফুডস লিমিটেড ভোজনরসিকদের জন্য নতুন মেনু আইটেম ‘কেএফসি কারি ক্রাঞ্চ’ উন্মোচন করেছে। দেশীয় পরিচিত স্বাদের সঙ্গে আধুনিক ফিউশনধর্মী অভিজ্ঞতা দিতে নতুন এই আয়োজন বাজারে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রিয় দল হারলে মন ভালো করার ৭টি কার্যকর উপায়

ফুটবলপ্রেমীদের কাছে প্রিয় দলের পরাজয় অনেক সময় আবেগজনিত হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রিয় দলের জার্সি পরে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে ম্যাচ উপভোগ এবং উচ্ছ্বাস ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ যেমন গভীর অনুভূতি তৈরি করে, তেমনি পরাজয়ের পর সেই আবেগই মন খারাপের রূপ নেয়।