ধর্ম


ইবাদত ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সময়ের মূল্য শেখায় রমজান


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৫ মার্চ ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

ইবাদত ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে সময়ের মূল্য শেখায় রমজান

সময়ের মূল্য নিয়ে যুগে যুগে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বহু মনীষী গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। রোমান দার্শনিক সেনেকা একবার বলেছিলেন, মানুষ সম্পদ রক্ষায় যতটা সচেতন, সময় ব্যয়ের ক্ষেত্রে ততটাই অসতর্ক। অথচ সময় সম্পদের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান।

 

মানবসভ্যতার ইতিহাসে সময়কে গুরুত্ব দেওয়ার উদাহরণ অসংখ্য। আধুনিক ইউরোপ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের মুসলিম সমাজ সবখানেই সময়কে সফল জীবনের অন্যতম মূল চাবিকাঠি হিসেবে দেখা হয়েছে। তবে একজন মুমিনের জীবনে সময় ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা পাওয়া যায় পবিত্র রমজান মাসে।

 

বিখ্যাত দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট সময়ের ব্যাপারে এতটাই কঠোর ছিলেন যে, তাঁর প্রতিদিনের বিকেলের হাঁটার সময় দেখে আশপাশের মানুষ নিজেদের ঘড়ি মিলিয়ে নিত। অন্যদিকে ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী (রা.) বলতেন, মানুষের জীবন আসলে কিছু মুহূর্তের সমষ্টি; একটি মুহূর্ত চলে যাওয়া মানে জীবনের একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া।

 

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ইমাম শাফেয়ি (রহ.) সময়কে তুলনা করেছেন ধারালো তলোয়ারের সঙ্গে। তাঁর মতে, যদি কেউ সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে, তবে সময়ই তাকে পরাজিত করবে।

 

মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এক হাদিসে সতর্ক করে বলেছেন, দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত একটি হলো সুস্থতা এবং অন্যটি অবসর বা সময়। পবিত্র কোরআনের সুরা আল-আসরেও সময়কে সাক্ষী রেখে মানুষের জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে।

 

মানুষের জীবনে অলসতা ও অবহেলার কারণে সময়ের অপচয় প্রায়ই ঘটে। কিন্তু রমজান মাস এ অভ্যাসকে অনেকটাই বদলে দেয়। এই এক মাস মানুষের জীবনকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে।

 

বছরের অন্য সময় যেখানে অনেকেই সময়ের ব্যাপারে কিছুটা উদাসীন থাকেন, সেখানে রমজানে দিনের প্রতিটি মুহূর্ত পরিকল্পনা করে চলতে হয়—কখন সেহরি, কখন ইফতার, কখন নামাজ ও ইবাদত।

 

সেহরি ও ইফতার কেবল খাবারের সময় নয়; এটি সময়ানুবর্তিতার এক অনন্য শিক্ষা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেহরি শেষ করা এবং ঠিক সময়ে ইবাদতে মনোনিবেশ করা একজন মানুষকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলে।

 

অন্যদিকে সারা দিন রোজা রেখে ইফতারের মুহূর্তের অপেক্ষা মানুষকে ধৈর্য ও সংযমের শিক্ষা দেয়। ইফতারের পরপরই মাগরিবের নামাজ আদায়ের তাগিদও সময়ের সঠিক ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলে।

 

আধুনিক বস্তুবাদী সমাজে সময়কে প্রায়ই অর্থের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সময়ের সর্বোত্তম ব্যবহার হলো ইবাদত ও কল্যাণকর কাজ।

 

রমজান আমাদের শেখায় শুধু নামাজ ও রোজাই নয়, বরং শরিয়তসম্মত যেকোনো ভালো কাজই ইবাদত। এই মাসে মানুষ গিবত, ঝগড়া বা অনর্থক আলাপ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে, যা সময়ের অপচয় কমাতে সাহায্য করে।

 

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, পরকালে মানুষ আফসোস করে বলবে “হায়! যদি আর একটু সময় পেতাম, তবে সব ভুল শুধরে নিতাম।” প্রতি বছর রমজান আমাদের সেই মূল্যবান সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই রমজানের এই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন ও সময় সচেতনতা যেন শুধু এক মাসে সীমাবদ্ধ না থাকে বরং বছরের বাকি সময়েও আমরা তা অনুসরণ করতে পারি, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।


সম্পর্কিত

ধর্মইবাদতরমজান

জনপ্রিয়


ধর্ম থেকে আরও পড়ুন

রমজানে যেসব সময় দোয়া কবুল হয়

রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনদের জন্য এক বিশেষ নিয়ামত। এ মাসে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের দুয়ার উন্মুক্ত থাকে এবং প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। হাদিসে এমন কিছু সময়ের কথা উল্লেখ আছে, যখন বান্দার দোয়া বিশেষভাবে কবুল হওয়ার আশা করা যায়। অথচ অনেকেই অজ্ঞতার কারণে এসব মূল্যবান সময় অবহেলায় কাটিয়ে দেন।

রোজা রেখে যে ১০টি কাজ আমাদের বর্জন করা উচিত

রমজান মাস কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, সংযম এবং নৈতিক শিক্ষার মাস। ইসলামি চিন্তাবিদরা বলেন, রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহভীতি (তাকওয়া) অর্জন করা, যা কোরআনেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—

মাহে রমজান: শুধু রোজা নয়, এটি চরিত্র গঠনের মাস- আমরা কি চরিত্রও শুদ্ধ করছি?

রমজান কেবল ক্ষুধা ও তৃষ্ণা বর্জনের মাস নয়। এটি আত্মসংযম, ধৈর্য, সহানুভূতি এবং সামাজিক দায়বোধ বৃদ্ধির মাস। ইসলামের শিক্ষায় রোজা কেবল খাদ্য-বর্জনের জন্য নয়, বরং মানুষের চরিত্র গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ইতিহাসে দ্বিতীয় রমজান: শাকহাবের প্রান্তরে মঙ্গোলীয় ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ

৯১ হিজরির ১ রমজানে আন্দালুস বিজয়ের যে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় ছয় শতক পর ৭০২ হিজরির ২ রমজানে সিরিয়ার মাটিতে রচিত হয় আরেক মহাকাব্যিক অধ্যায়। এদিন ‘শাকহাবের যুদ্ধ’ (১৩০৩ খ্রি.) কেবল একটি সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; এটি ছিল মুসলিম সভ্যতার টিকে থাকার প্রশ্নে এক চূড়ান্ত লড়াই।