কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশের সময়ে ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের কার্যকর ব্যবহার, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘এআইফোরবিটি গ্লোবাল সামিট’ শেষ হয়েছে। এআই, ইআরপি, ব্যাংকিং, নেতৃত্ব, ব্যবসায়িক কৌশল ও সাইবার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন খাতের দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা ভার্চুয়াল এ আয়োজনে অংশ নেন।

বাংলাদেশ সময় শুক্রবার রাতে শুরু হওয়া এ সম্মেলন শেষ হয় রোববার রাতে। তিন দিনের আয়োজনে এআইকে শুধু প্রযুক্তি হিসেবে গ্রহণ নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কাঠামো, কর্মী দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও কৌশল তুলে ধরেন বক্তারা।

সামিটের প্রথম দুই দিনে এআইভিত্তিক ব্যবসায়িক রূপান্তর, এন্টারপ্রাইজের শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিংয়ের (ইআরপি) ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। এসব সেশনে দেশ-বিদেশের প্রযুক্তি, ব্যবসা, ব্যাংকিং ও নেতৃত্ব খাতের বিশেষজ্ঞরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

citytouch 728-X-90

আলোচকদের মধ্যে ছিলেন এআই স্ট্র্যাটেজি ও গভর্ন্যান্স অ্যাডভাইজার সারাহ করনেট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, গ্রামীণফোনের সিবিও ড. আসিফ নাইমুর রশিদ, আইবিএম সার্টিফায়েড কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ডেভেলপার মুজতবা সাত্তার অনন্ত, ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট ও এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট মার্ক অনুপম মল্লিক এবং লিডারশিপ এডুকেটর ও কোচ ড. পিটার কে. ইউন।

এ ছাড়া প্রাইম ব্যাংক পিএলসির এসভিপি ও হেড অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন এম এম মাহবুব হাসান, বিজনেস কোচ ও লিডারশিপ ট্রেইনার কামরুল হাসান, মাস্টার সার্টিফায়েড কোচ শবনম মোস্তারি এবং ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রাইসুল কবিরসহ বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীরা আলোচনায় অংশ নেন।

সমাপনী দিনে সাইবার নিরাপত্তায় গুরুত্ব

সামিটের তৃতীয় ও সমাপনী দিনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা গভর্ন্যান্স, এআই রেডিনেস এবং ব্যবসায়িক উৎপাদনশীলতা। এদিন সাইবার সিকিউরিটি ও ডেটা গভর্ন্যান্স নিয়ে কীনোট উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন ইউনিভার্সিটির সাইবার সিকিউরিটি ও এআই গভর্ন্যান্স চেয়ার ড. শরীফুল ইসলাম।

তার আলোচনায় এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এআই ব্যবহারের জন্য বিশ্বস্ত ও নিরাপদ ডেটার ভিত্তি তৈরি, ডেটা ব্যবস্থাপনা এবং গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তোলার বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

এরপর ট্রান্সফরমেশন লিডার ড. আরিফ আজাদ, পিএমপি নিয়ন্ত্রিত এন্টারপ্রাইজ খাতে এআই ব্যবহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রকৌশলগত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত প্রটোকল মেনে চলা এবং এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

এআই ব্যবহারে মানবসম্পদের প্রস্তুতি

সমাপনী দিনে হিউম্যান এআই রেডিনেস নিয়ে কীনোট উপস্থাপন করেন এআইফোরবিটি গ্লোবালের রেসপনসিবল এআই অ্যাডভাইজার ফ্র্যাঙ্ক লিবার এবং এআইচালিত রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ টিনা লিবার।

তারা এআইভিত্তিক রূপান্তরের সময়ে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে কর্মীরা কতটা প্রস্তুত এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

এআই কীভাবে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে

সমাপনী দিনের গোলটেবিল আলোচনায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ নেন লিডারশিপ ও লার্নিং আর্কিটেক্ট মোহাম্মদ নুর ই আলম, এডব্লিউএস অ্যালায়েন্সেসের ভিপি মোহাম্মদ জামান, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন ও এআই কনসালট্যান্ট হাদি ভূঁইয়া, এন্টারপ্রাইজ এআই ও টেক স্ট্র্যাটেজিস্ট মেহেদি হাসান রানা এবং এন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশন বিশেষজ্ঞ ফারুক আজম আরশাদ।

এ ছাড়া ট্রান্সফরমেশন ও স্ট্র্যাটেজি কনসালট্যান্ট খান ফারহানা, এআই ও ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন লিডার আরিফ হোসেন এবং প্রাইম ব্যাংকের এম এম মাহবুব হাসানও আলোচনায় অংশ নেন।

গোলটেবিল আলোচনায় এআই দিয়ে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় করা এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ডেটা ব্যবহারের বিভিন্ন দিক উঠে আসে।

এআই এজেন্টের ব্যবহার দেখানো হয় হাতে-কলমে

গোলটেবিলের পর স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট কীভাবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক কাজ সম্পন্ন করতে পারে, তার একটি ব্যবহারিক প্রদর্শনী করেন মেটামরফোসিস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান।

তার প্রদর্শনীতে এআই এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশফ্লো পূর্বাভাসসহ বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া তুলে ধরা হয়। এতে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগের একটি চিত্র অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরা হয়।

এরপর এন্টারপ্রাইজ ওরাকল ইআরপি ও এআই স্ট্র্যাটেজিস্ট মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল মিয়া এআইয়ের মাধ্যমে ওরাকল ইআরপি রূপান্তর নিয়ে আলোচনা করেন।

বড় প্রতিষ্ঠানে এআই রূপান্তরের কৌশল

সমাপনী দিনের শেষ আলোচক ছিলেন এন্টারপ্রাইজ অ্যাজাইল কোচ ও স্কেলড অ্যাজাইল প্রোগ্রাম কনসালট্যান্ট (এসপিসি) উবেদা সাউদা। তিনি বড় পরিসরে অ্যাজাইল রূপান্তরের কার্যকর পদ্ধতি, বাস্তবায়নের সময়কার বিভিন্ন বাধা এবং কৌশলগত এআই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে টিম গঠনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

তার বক্তব্যের পর ৯০ দিনের এন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশন ব্লুপ্রিন্ট উন্মোচন করা হয়। পাশাপাশি ডেলিগেট মাস্টারক্লাস সার্টিফিকেশন এবং সামিট-পরবর্তী অ্যাডভাইজরি অংশীদারত্বের ঘোষণাও দেওয়া হয়।

সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ বৈশ্বিক আয়োজন শেষ হয়। বক্তব্য দেন এআই ট্রান্সফরমেশন কোচ ও এআইফোরবিটি গ্লোবালের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান এবং বিজনেস এআই ট্রান্সফরমেশন এক্সপার্ট ও ইআরপি কনসালটেন্ট সাদিক মোহাম্মদ আলম।