ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী ও শহরের অন্যতম প্রধান বাজার আনন্দবাজার। দীর্ঘদিন ধরে এ বাজারটি জেলার মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারটির মাছ ব্যবসায়ীদের একটি অংশের বিরুদ্ধে ওজনে কারচুপি, মাছে কেমিক্যাল ও রং মেশানো, চিংড়িতে জেলি দিয়ে ওজন বাড়ানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে অসদাচরণের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি বাজারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।


স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারটির নামকরণ জমিদার আনন্দ বাবুর নামানুসারে হয়েছে বলে প্রচলিত রয়েছে। বাজারটি প্রতিষ্ঠার সময় মাছ, শুটকি, সবজি, মুদি পণ্য ও মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য পৃথক স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই বাজারটির কার্যক্রম চলে আসছে।

citytouch 728-X-90

তবে বর্তমানে বাজারের মাছ ও শুটকি মহলকে ঘিরে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে ওজনে কারচুপি, মাছ সংরক্ষণে কেমিক্যাল বা রং ব্যবহারের অভিযোগ, চিংড়িতে জেলি মেশানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ রয়েছে।


সম্প্রতি ওজনে কারচুপির অভিযোগে আনন্দবাজারের এক মাছ ব্যবসায়ীকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) পরিচালিত অভিযানে ওজনের পাল্লায় কারচুপির বিষয়টি ধরা পড়ে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীও বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

তবে ওই ব্যবসায়ীর দাবি, বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে সৎভাবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।


দোকানের ব্যবসায়ী সিয়াম মাহমুদ ও আপেল মাহমুদ বলেন, “গত ১০ বছর ধরে আমরা এই বাজারে মাছ বিক্রি করছি। আমাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ উঠে নাই। আমাদের পরিবারে ১২ জন সদস্য রয়েছে । এই ব্যবসার আয় দিয়েই আমাদের পরিবারের খরচ চলে। কিন্তু বাজারে বর্তমানে একটি সিন্ডিকেটের কারণে আমরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছি।”


তাদের অভিযোগ, “সিন্ডিকেটের সঙ্গে টিকে থাকতে গিয়ে গত দেড় মাসে আমাদের প্রায় ৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। আমরা যে মাছ ২ হাজার ১০০ টাকা কেজি দরে কিনে আনি, তারা সেটি ২ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি করে। কিন্তু ওজনে কম দিয়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি আদায় করে।”


তারা আরও অভিযোগ করেন, “১ হাজার গ্রামের পরিবর্তে ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম মাছ দিয়ে পাল্লায় ১ হাজার গ্রাম দেখানো হয়। ক্রেতার পক্ষে বিষয়টি বোঝা কঠিন। এ ছাড়া ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগও রয়েছে।”


তাদের ভাষ্য, বাজারে চলমান অনিয়মের বিষয়টি সামনে আনতেই তারা ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানের সময় পাল্লায় সুতা ও গামছা বেঁধে কারচুপির কৌশলটি প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। এজন্য ১ লাখ টাকা জরিমানা হলেও তারা এতে বিচলিত নন বলেও দাবি করেন তারা।


তাদের দাবি, “আমরা চাই কোনো ক্রেতা প্রতারিত না হোক। ক্রেতারা তাদের টাকা যেখানে খুশি খরচ করবেন, কিন্তু প্রতারণার শিকার যেন না হন। এজন্য বাজারটি পৌরসভা, ভোক্তা অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজনে সপ্তাহে অন্তত একবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হোক।”


তবে আনন্দবাজার মৎস্য ও শুটকি মহল কমিটির আহ্বায়ক ও যুগ্ম আহ্বায়কদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


বাজারের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, বাজারের বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা সরাসরি তিতাস নদীতে ফেলা হচ্ছে। বিশেষ করে গরু জবাইয়ের পর উৎপন্ন রক্ত, নাড়িভুঁড়ি ও অন্যান্য বর্জ্য নদীতে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।

এতে বাজারসংলগ্ন তিতাস নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। বাজারে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।


তরী বাংলাদেশের আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রথম বাজার হিসেবে আনন্দবাজারকে সবাই চেনে। ঐতিহ্যবাহী এই বাজারে বর্তমানে ওজনে কারচুপি, কেমিক্যাল ও রং মেশানো, জেলি মেশানো এবং ক্রেতাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের মতো অভিযোগ উঠছে। চাকরিসহ বিভিন্ন কারণে জেলার বাইরে থেকে আসা অনেক মানুষও এখানে বসবাস করেন। ঐতিহ্যবাহী বাজার হওয়ায় তারা বাজার করতে এখানে আসেন। কিন্তু এসে যদি প্রতারণার শিকার হন, সেটি জেলার জন্যও বদনামের বিষয়।”


তিনি ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ক্রেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে হবে। ওজনে কারচুপি, কেমিক্যাল বা রং মেশানোসহ সব ধরনের অনিয়ম থেকে বেরিয়ে এসে সৎভাবে ব্যবসা করতে হবে। ক্রেতাদের সঙ্গে ভালো আচরণের মাধ্যমে বাজারের ঐতিহ্য ও সম্মান ধরে রাখতে হবে।”


বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, “বাজারের ময়লা নদীতে ফেলে পরিবেশ আইন ভঙ্গের পাশাপাশি তিতাস নদীকেও হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে। বাজারে একটি আধুনিক পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা প্রয়োজন।”


ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক শরিফুল ইসলাম সাংবাদিককে বলেন, “শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ময়লা ও দূষণমুক্ত রাখতে ইতোমধ্যে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই পৌরসভার পক্ষ থেকে ঠিকাদারকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ওই সপ্তাহ থেকেই কার্যক্রম শুরু হবে।”


তিনি বলেন, “আমরা আশাবাদী, যত্রতত্র ময়লা ফেলা ও পরিবেশ দূষণ থেকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডকে দ্রুত মুক্ত করা সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডেও ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে শহরকে ময়লা ও দূষণমুক্ত করা হবে।”


আনন্দবাজারের ব্যবসায়িক অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ওজনে কারচুপি, মাছে কেমিক্যাল বা রং মেশানো এবং ভোক্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে এবং তা চলমান থাকবে। পাশাপাশি ভোক্তা অধিদপ্তরও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।”


বাজার কমিটি প্রসঙ্গে পৌর প্রশাসক বলেন, “কমিটি কার্যকর না হলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে নতুন কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”


আধুনিক পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, “ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আসার পরপরই আমি চিন্তা করেছি, এত পুরনো একটি শহরের ঐতিহ্যবাহী বাজারে একটি আধুনিক পশু জবাই ও মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। আর্থিক ও জায়গার সংকটের কারণে এখনো তা করা সম্ভব হয়নি। জায়গা নির্ধারণ করা গেলে আর্থিক বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা করা হবে।”


আনন্দবাজারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ব্যবসায়িক অনিয়ম বন্ধ, ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষা, নিয়মিত নজরদারি এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।