আন্তর্জাতিক


বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগামছাড়া হওয়ার শঙ্কা, সরবরাহ সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:২৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার

বিশ্ববাজারে তেলের দাম লাগামছাড়া হওয়ার শঙ্কা, সরবরাহ সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এত দিন বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা করে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা বৈশ্বিক তেলবাজার এবার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশ্লেষকেরা। তাঁদের আশঙ্কা, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করতে পারে।

 

যুদ্ধ শুরুর পর অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও তা এখনো ২০২২ সালের ব্যারেলপ্রতি ১২৮ ডলার কিংবা ২০০৮ সালের সর্বোচ্চ ১৪৬ ডলারের রেকর্ড স্পর্শ করেনি। তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাতের বিস্তার, তেল পরিবহনের রুটে জটিলতা এবং বৈশ্বিক মজুত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক কৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সংঘাত এখন আরও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এত দিন বাজার যেকোনো সংকটের বিকল্প পথ বের করে নিতে পারবে বলে যে ধারণা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ছে।

 

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার অতিক্রম করে। পরে কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার এবং ডিজেলের দাম ৫ দশমিক ২০ ডলারের ওপরে রয়েছে। একই সঙ্গে বন্ড বাজার মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

সংঘাতের আগে লোহিত সাগর হয়ে বিকল্প পথে তেল পরিবহন সম্ভব হলেও এখন পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। জেপি মরগানের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে ওই নৌপথে অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিকল্প হিসেবে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরে পাঠানো হচ্ছে।

 

তবে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস জানিয়েছে, সেই বিকল্প ব্যবস্থাও এখন ঝুঁকির মুখে। বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের অবরোধের কারণে সৌদি আরবের প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

 

জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, সৌদি আরব চাইলে সুয়েজ খাল হয়ে উত্তরমুখী রুট ব্যবহার করতে পারে। তবে গভীরতার সীমাবদ্ধতার কারণে বড় তেলবাহী জাহাজ ওই পথে চলতে পারে না। ফলে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে আফ্রিকা ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে।

 

হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য নতুন করে বিমা জটিলতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের সময় বাড়তি প্রিমিয়াম দিয়ে বিমা পাওয়া গেলেও এখন ভবিষ্যতে সেই সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

 

ইরান প্রতি ব্যারেল তেলে ১ থেকে ২ ডলার টোল আরোপের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তবে লয়েডস মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় ইরানকে এ ধরনের অর্থ পরিশোধ করা বেআইনি হতে পারে।

 

ফলে কোনো জাহাজ ইরানকে টোল দিলে তার বিমা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, টোল না দিয়ে প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তারা জাহাজে হামলা চালাতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক শিপিং খাতে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

 

মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি রাশিয়াকেও এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার এবং কৃষ্ণসাগরে অবস্থিত কাসপিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়ামের টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

পরিস্থিতি সামাল দিতে রাশিয়া ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করেছে। লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার আগে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৮ লাখ ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করত, যা বিশ্বের মোট ডিজেল রপ্তানির প্রায় ১২ শতাংশ।

 

একই সময়ে কাসপিয়ান পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১৭ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের মজুতও দ্রুত কমে যাচ্ছে। পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক মজুত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকলেও গত পাঁচ মাসে তা ১৩০ কোটি ব্যারেল কমেছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেল মজুতও বসন্তের পর থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল কমে ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। দেশটির হাতে এখন কংগ্রেস নির্ধারিত সীমার আগে ব্যবহারের জন্য মাত্র ৬ কোটি ব্যারেল তেল অবশিষ্ট রয়েছে।

 

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে ৪৪টি ট্যাংকার অবস্থান করছে। সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগে এই সংখ্যা ছিল ৯৭টি।

 

গত কয়েক মাসে বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল চীনের আগেই বিপুল পরিমাণ তেল মজুত করে রাখা। এতে উচ্চমূল্যের সময় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে দেশটির আমদানির প্রয়োজন কমে যায়।

 

তবে নাতাশা কানেভার মতে, চীন আরও তিন থেকে চার মাসের বেশি সময় মজুতের ওপর নির্ভর করতে পারবে না। এরপর দেশটিকে আবার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বড় পরিসরে তেল আমদানি শুরু করতে হবে।

 

বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দামে আরও বড় উল্লম্ফনের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। গোল্ডম্যান স্যাকসের তেলবিষয়ক গবেষণা বিভাগের প্রধান ড্যান স্ট্রুইভেনের ধারণা, অক্টোবরের মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার অতিক্রম করতে পারে।

 

আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফটের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যদি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।

 

 


সম্পর্কিত

মূল্যস্ফীতিতেল

জনপ্রিয়


আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আসামের মন্ত্রীর মেয়ে, অস্বস্তিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার

আসামের রাজস্বমন্ত্রী কেশব মহন্তের মেয়ে দিবিসা মহন্ত শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ায় রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) গুয়াহাটির চাচলে আয়োজিত শিক্ষার্থীদের এক প্রতিবাদ সমাবেশে তাঁর অংশগ্রহণকে ঘিরে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের মধ্যে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগেও থামছে না ককরোচদের আন্দোলন, বাকি দুই দাবি পূরণের ঘোষণা

কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, বাকি দুটি দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকবে।

‘প্রশ্নফাঁসের দায় প্রথম দিন থেকেই নিয়েছি’ আবেগঘন খোলা চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

টানা কয়েকদিনের বিক্ষোভ, রাজনৈতিক চাপ এবং নীট-ইউজি (NEET-UG) পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস বিতর্কের জেরে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশ করেছেন একটি আবেগঘন খোলা চিঠি। সেখানে তিনি লিখেছেন, “প্রশ্নফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার প্রথম দিন থেকেই আমি এর দায় নিয়েছি। এই সংকট থেকে কখনও মুখ ফিরিয়ে নিইনি।”

‘তেলাপোকাদের’ আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করলেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান

ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। শনিবার এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।