হুথিরা জানিয়েছে, সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে তারা বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় খামিস মুশাইত শহরের একটি সৌদি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে আবহা, ইয়েমেন সীমান্তবর্তী নাজরান এবং লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী জাজানে হামলা চালানো হয়।
জাজানে একটি বড় তেল শোধনাগার ও বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। স্যাটেলাইটের ছবিতে সেখানকার শোধনাগারের ওপর ঘন কালো ধোঁয়ার মেঘ দেখা গেছে। আবহার একটি তেল বিতরণ কেন্দ্র থেকেও বড় আকারের ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার পর কয়েকটি স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবে এটিকে সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তেলের বাজারে ফের অস্থিরতা
সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাগুলোতে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠে যায়। ২৪ জুলাইয়ের পর এটিই ব্রেন্টের সর্বোচ্চ দাম।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তেল স্থাপনা ও পরিবহন অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেনে সংঘাত তীব্র হচ্ছে
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরব ইয়েমেনে হুথিদের বিরুদ্ধে আরব জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংঘাত অনেকটা স্তিমিত থাকলেও নতুন করে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের প্রবেশপথে নৌযান চলাচলে হামলার হুমকিও দিয়েছে হুথিরা।
সম্প্রতি সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বিভিন্ন দিক থেকে অভিযান শুরু করেছে। এর আগে হুথিরাও সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থানগুলোতে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
রাজধানী সানা থেকে বিতাড়িত ইয়েমেন সরকার এখন হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, গত তিন দিনে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের সংঘর্ষের কারণে ১৮ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
পাল্টাপাল্টি হুমকি
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালকি বলেছেন, হুথি মিলিশিয়াদের প্রতিহত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সামরিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অন্যদিকে হুথি মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি অভিযোগ করেছেন, ইয়েমেনে বিমান হামলা চালিয়ে রিয়াদই সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর জবাব দেয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
হরমুজ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রেখে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে অবরোধের মাধ্যমে ইরানের তেল রফতানি বন্ধ করার চাপও অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে তেহরান পাল্টা ‘মেরিটাইম এক্সক্লুশন জোন’ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইরানের দাবি, এই অঞ্চল হরমুজ প্রণালি হয়ে পারস্য উপসাগরের ভেতর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
ফলে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় নতুন করে হামলা, ইয়েমেনে সংঘাতের বিস্তার এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।










