মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও দেশটির শাসনব্যবস্থা এখনও কার্যকর ও সক্রিয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সর্বোচ্চ নেতা ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হওয়ার পরও কৌশল নির্ধারণ ও সামরিক কার্যক্রমে কোনো ভাঙন দেখা যায়নি।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি বহুমাত্রিক ও জটিল ক্ষমতা কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই কাঠামো কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং ধর্মীয় আদর্শ, সামরিক শক্তি এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়।
যুদ্ধের শুরুর দিকেই এক হামলায় দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ১৯৮৯ সাল থেকে তার নেতৃত্বে পরিচালিত ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি ‘ভেলায়েত-ই ফকিহ’ অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতাই ছিলেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা।
বর্তমানে তার ছেলে মোজতবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে তিনি এখনো তার পিতার মতো প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি। আহত অবস্থায় তাকে ‘আহত বীর’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে তার উপস্থিতি সীমিত।
আইআরজিসি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সাম্প্রতিক সংঘাত এবং নেতৃত্ব সংকটের পর এই বাহিনীর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। তাদের “মোজাইক কাঠামো” অনুযায়ী প্রতিটি পদে বিকল্প নেতৃত্ব প্রস্তুত থাকায় দ্রুত পুনর্গঠন সম্ভব হয়েছে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি নেটওয়ার্ক পরিচালনার দক্ষতা এই বাহিনীকে বর্তমান সংকটে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা ধর্মীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, পার্লামেন্ট ও বিচার বিভাগের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। শীর্ষ উপদেষ্টা আলি লারিজানির মৃত্যু শাসনব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা হলেও অন্যান্য অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতারা এখন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে আরও কট্টর অবস্থান নিতে পারে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বর্তমানে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি—
- আহমদ ওয়াহিদি — আইআরজিসির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
- ইসমাইল কানি — কুদস ফোর্সের প্রধান, আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
- আলিরেজা তাংসিরি — আইআরজিসি নৌবাহিনীর প্রধান।
- মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ — পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা।
- আয়াতুল্লাহ মোহসেনি-এজেই — বিচার বিভাগের প্রধান।
- মাসুদ পেজেশকিয়ান — নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন।
- সাঈদ জলিলি — কট্টরপন্থী নেতা ও সাবেক পরমাণু আলোচক।
- আয়াতুল্লাহ আলিরেজা আরাফি — অন্তর্বর্তীকালীন কাউন্সিলের সদস্য।
- আব্বাস আরাঘচি — পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সক্রিয়।
শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো কার্যকর রয়েছে—যার পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত, বহুমাত্রিক ক্ষমতা কাঠামো। ধর্মীয় নেতৃত্ব, সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত এই ব্যবস্থাই সংকটকালেও রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স