২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। এই অর্থের পেছনে আছেন লাখো প্রবাসী কর্মী কেউ বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করছেন, কেউ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছেন, কেউ পরিবার থেকে হাজার মাইল দূরে প্রতিকূল পরিবেশে জীবন কাটাচ্ছেন। তাই প্রশ্নটা শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, যারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে এত বড় অবদান রাখছেন, রাষ্ট্র তাদের জন্য কতটা করছে?

প্রবাসীদের জন্য সরকারের উদ্যোগ একেবারে নেই এ কথা বলা যাবে না। ভোটাধিকারের স্বীকৃতি, শ্রমবাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ, বিমানবন্দরে প্রবাসী লাউঞ্জ, অনলাইন সেবা এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু বাস্তবতার জায়গায় এখনো বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

বিদেশ যাওয়ার আগেই একজন কর্মীকে পড়তে হয় দালাল, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও ভিসা-বাণিজ্যের ফাঁদে। সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা দিয়ে বিদেশ যেতে গিয়ে অনেক পরিবারকে জমি বিক্রি করতে হয়, ঋণ নিতে হয়। অথচ বিদেশে গিয়ে সেই কর্মী যদি কম মজুরি পান, নিয়োগকর্তার হাতে আটকে পড়েন কিংবা বিপদে পড়েন, তখন প্রতিকার পাওয়ার পথও সবসময় সহজ হয় না।

সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আমাদের অভিবাসন ব্যবস্থা এখনো দক্ষতার চেয়ে সংখ্যার ওপর বেশি নির্ভরশীল। বছরে ১০ লাখের বেশি মানুষ বিদেশে গেলেও তাদের বড় অংশ নিম্নদক্ষ কর্মী। এতে রেমিট্যান্স বাড়লেও কর্মীদের আয় ও দরকষাকষির ক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। বরং সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে।

সংকটের সময়ও প্রবাসীদের ঝুঁকি কম নয়। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত উদ্ধার, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর সেটি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বিদেশে একজন কর্মীর মৃত্যু মানে শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষকে হারানো নয়; অনেক সময় তার পেছনে থাকে ঋণ, বিক্রি করা সম্পদ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

অন্যদিকে বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনার ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রকে আরও বাস্তববাদী হতে হবে। হুন্ডি বন্ধ করতে শুধু অভিযান নয়, বৈধ পথকে হুন্ডির চেয়ে সহজ, দ্রুত ও সাশ্রয়ী করতে হবে। ব্যাংকিং সেবার খরচ, লেনদেনের সময় এবং বিনিময় হারের ব্যবধান কমাতে না পারলে শুধু আইন প্রয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

এখন দরকার অভিবাসন ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার। বিদেশ যাওয়ার আগে সরকারি ডেটাবেজে যাচাই করা চাকরির তথ্য, স্বচ্ছ খরচ, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন এবং দালালমুক্ত নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কম সুদের অভিবাসন ঋণ সহজলভ্য করতে হবে, যাতে একটি পরিবার বিদেশ যাওয়ার জন্য মহাজনের কাছে ঋণগ্রস্ত না হয়।

একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও শ্রমবাজার বহুমুখীকরণে জোর দিতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের মতো দক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। কম কর্মী গেলেও যদি তারা বেশি আয় করতে পারেন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পান, সেটিই দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বেশি লাভজনক।

প্রবাসীদের দেশে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। ভূমি দখল, প্রতারণা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ কিংবা পারিবারিক সংকটে উপজেলা পর্যায়ে কার্যকর ‘প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক’ চালু করা যেতে পারে। বিদেশে থাকা ব্যক্তির জন্য দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

রেমিট্যান্সকে শুধু ভোগের অর্থ হিসেবে দেখলেও চলবে না। প্রবাসীদের অর্থ দেশে বিনিয়োগে আনতে সহজ বিনিয়োগ ব্যবস্থা, প্রবাসী বন্ড, পেনশন, গৃহঋণ ও ব্যবসায়িক ঋণের সুযোগ আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। একজন প্রবাসী যেন শুধু টাকা পাঠানো মানুষ না হয়ে দেশের অর্থনীতির একজন বিনিয়োগকারীও হতে পারেন সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ডলারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন মানুষের শ্রম, ত্যাগ, ঋণ, অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের অপেক্ষা। তাই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলে প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রকৃত দায়িত্ব।

প্রবাসীরা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। বিনিময়ে রাষ্ট্রের কাছে তাদের চাওয়া খুব বেশি নয় নিরাপদে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ, ন্যায্য খরচ, বিদেশে সুরক্ষা, দ্রুত আইনি সহায়তা এবং দেশে পরিবার ও সম্পদের নিরাপত্তা।