

ইতালির রাজধানী রোমের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ৪৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক শাহাদাত হোসেনকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছে ইতালির পুলিশ। নিহতরা হলেন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাদের আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দম্পতির ২০ বছর বয়সী ছেলে আমির, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস আগে যুক্তরাজ্য থেকে রোমে আসেন শাহাদাত হোসেন। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, তিনি আরজু বেগমের প্রতি একতরফা আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পুলিশ এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছিলেন শাহাদাত। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “কেউ একা মারা যায় না। সবসময় তার সঙ্গে আরেকজনও মারা যায়। মৃত্যু এলে নিজের প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে কাউকে প্রিয়জন হারানোর কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে না হয়।” তদন্তকারীরা ওই পোস্টটিকেও গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করছেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার রাত ৯টার কিছু পর একটি ধারালো দা (ম্যাশেটি) নিয়ে কামাল উদ্দিনের বাসায় প্রবেশ করেন শাহাদাত। প্রথমে আরজু বেগম ও তাদের আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। পরে কামাল উদ্দিনকেও হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ তিনটি বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।
পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত ছেলে
হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় এসে বাবা-মা ও ছোট বোনকে রক্ষার চেষ্টা করেন পরিবারের বড় ছেলে আমির। হামলাকারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন। বর্তমানে তিনি রোমের জেমেলি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রক্তাক্ত অবস্থায় আমির বারবার বলছিলেন, “সে আমার মাকে হত্যা করেছে, আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে।” পুলিশকে তিনি হামলাকারীর নামও জানান এবং বলেন, “এটা শাহাদাতই করেছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা আগোস্তিনো জানান, ঘটনার সময় তিনি টেলিভিশনে ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন। হঠাৎ চিৎকার শুনে বাইরে এসে দেখেন, আমির রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন এবং এক ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালাচ্ছেন। পরে হামলাকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পলাতক শাহাদাতের সন্ধানে অভিযান
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই পলাতক রয়েছেন শাহাদাত হোসেন। তাকে গ্রেফতারে কাসালোত্তি এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে ইতালির পুলিশ। পাশাপাশি দেশজুড়ে তার সন্ধানে অভিযান চালানো হচ্ছে।
রোববার বিকেলে বোলোনিয়া রেলস্টেশন থেকে তার সম্ভাব্য অবস্থানের খবর পাওয়া গেলেও পরে সেটি ভুল তথ্য বলে নিশ্চিত হয় পুলিশ।
ঘটনাস্থল থেকে শাহাদাতের ফেলে যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনটির তথ্য বিশ্লেষণের পাশাপাশি নিহত পরিবারের স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা।
বাংলাদেশে একই এলাকার বাসিন্দা
স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যদের দাবি, নিহত পরিবার এবং শাহাদাত হোসেন—উভয়ের বাড়িই বাংলাদেশের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। তারা একই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
জানা গেছে, কামাল উদ্দিন ২০০৯ সালে স্ত্রীকে নিয়ে ইতালিতে পাড়ি জমান। অন্যদিকে প্রায় ছয় মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে লন্ডন থেকে রোমে আসেন শাহাদাত।
স্থানীয়দের দাবি, শাহাদাত দীর্ঘদিন ধরেই আরজু বেগমের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে আসক্ত ছিলেন। তবে তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি।
রোমের প্রসিকিউটর অফিস এ ঘটনায় হত্যা ও গুরুতর আহত করার অভিযোগে মামলা করেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, শাহাদাতকে দ্রুত গ্রেপ্তার করাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এরপর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং ঘটনার পেছনের সব কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা হবে।
সূত্র: ইতালীয় সংবাদমাধ্যম লা স্তাম্পা







