অপরাধ


পাওনা টাকার জন্য দুই মাস ধরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গৃহবধূর মৃত্যু


হেড অফ ডিজিটাল মিডিয়া

শামসুল আলম

প্রকাশিত:৩১ মে ২০২৪, ০১:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার

পাওনা টাকার জন্য দুই মাস ধরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গৃহবধূর মৃত্যু
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলায় ধার নেওয়া ২০ হাজার টাকা দিতে না পারায় এক গৃহবধূকে দুই মাস  ধরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। বিচার চেয়ে না পেয়ে ওই গৃহবধূ ও তার স্বামী বিষপান করেছেন। এতে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় স্বামী বিছানায় কাতরাচ্ছেন। 
গত শুক্রবার (২৪ মে) ওই দম্পতি বিষপান করেন। পাঁচ দিন ধরে ‘বিষক্রিয়ার’ সঙ্গে লড়াই শেষে বুধবার (২৯ মে) দুপুরে গৃহবধূর মৃত্যু হয়। উপজেলার সদর ইউনিয়নের কলেজপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ওই দম্পতির তিন বছরের এক শিশুসন্তান রয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলো—উপজেলার সদর ইউনিয়নের হলপাড়া গ্রামের আবুসামার ছেলে জয়নাল মিয়া এবং তার সহযোগী কারিগরপাড়ার শুক্কুর কসাই, ডাকাতপাড়ার আলম কসাই ও টাঙ্গাইলপাড়ার সোলেমান।
মৃত্যুর আগে ২২ মে স্থানীয় কয়েকজনের কাছে দেওয়া গৃহবধূর জবানবন্দির একটি অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। এতে পাশবিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। বর্ণনায় উঠে এসেছে কীভাবে জয়নাল ও সহযোগীরা মাসের পর মাস তাকে ধর্ষণ করেছে।
বর্ণনায় গৃহবধূ বলেছেন, ‘আমার বাবা নেই। মা গৃহকর্মীর কাজে বিদেশে থাকেন। স্বামী টাঙ্গাইলে শ্রমিকের কাজ করেন। স্বামীর ধারের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় জয়নাল গত রমজান মাসের শুরু থেকে ধর্ষণ শুরু করে। পরে তার সহযোগী আলম কসাই, শুক্কুর কসাই ও সোলেমান দিনের পর দিন পালাক্রমে ধর্ষণ করেছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে তাদের নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে বাধ্য হয়ে স্বামীকে বিস্তারিত ঘটনাটি জানাই। পরে স্থানীয় মাতব্বরদের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনও বিচার পাইনি।’
মৃত্যুর আগে গৃহবধূ আরও জানান, পাওনা টাকার জন্য প্রথমে জয়নাল তাকে নিয়মিত ধর্ষণ করতে থাকে। পরে তার সহযোগী আলম, শুক্কুর ও সোলেমানকে নিয়ে এসে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। মোবাইল ফোনে সে ভিডিও ধারণ করে, তা প্রকাশের হুমকি দিয়ে ধর্ষণের ঘটনা কাউকে জানাতে ভয় দেখায়। এরপর নানাভাবে হুমকি দিয়ে জয়নাল ও শুক্কুর বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণ করেছে। তাদের পাশবিক নির্যাতনে বাধ্য হয়ে বিষপান করেন।ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, ‘এরপরও জয়নাল আবার ফোন দিয়ে আমার কাছে টাহার (টাকা) চাপ দেয়। আমি বলি কীসের টাহা। টাহার জন্য এতো কিছু। সংসারে অশান্তি। টাহা ফেরত দিলে আমার ইজ্জত ফেরত দিবা। দিনের পর দিন আমারে শেষ করছো। তখন জয়নাল হুমকি দিয়া কয়, টেহা কীভাবে তোলা লাগে দেখমু।’
ওই গৃবধূর স্বামী বলেন, ‘আমি টাঙ্গাইল থাইকা ফিইরা দেখি বউয়ের শরীর ভাইঙ্গা গেছে। আমি জিগাইলে হে খালি কান্দে। পরে সব জানতে পারি। বিচার চাইলে তারা ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। জয়নাল আমারে মাইরা ফেলার হুমকি দেয়।’কত টাকা ধার নিয়েছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঘর করার জন্য আমি ২০ হাজার আর স্ত্রী ২০ হাজার নিয়েছিল। পরে ২০ হাজার পরিশোধ করেছি। বাকি টাকার জন্য এত কিছু ঘটে গেলো।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সদস্যসহ স্থানীয়দের কাছে বিচার দিলেও কোনও সমাধান মেলেনি। গত শুক্রবার গৃহবধূ ও তার স্বামী বিষপান করেন। গুরুতর অবস্থায় তাদের রাজিবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে জামালপুর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসক ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। কিন্তু টাকা না থাকায় এই দম্পতি বাড়িতে চলে আসেন। বুধবার বাড়িতেই গৃহবধূর মৃত্যু হয়। পরে লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই দম্পতি বিষপানের পর স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে থানা পুলিশ ভুক্তভোগীদের ২০ হাজার টাকা দেওয়ার বিনিময়ে ঘটনা মীমাংসার করার সিদ্ধান্ত দেয়। জয়নাল ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা দিলেও তা নিতে অস্বীকৃতি জানান ওই দম্পতি।অভিযোগের বিষয়ে জানতে জয়নাল মিয়ার মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়।স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ঘটনাটি গোপন ছিল। আমরা জানতাম না। গৃহবধূর স্বামী একেকবার একেক কথা কয়। বিষ খাওয়ার পর চিকিৎসার জন্য জয়নাল ২০ হাজার টাহা দিছে। হের স্বামী নেয় নাই।’ধর্ষণের ঘটনা পুলিশকে নিয়ে কীভাবে টাকা দিয়ে মীমাংসার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে এই ওয়ার্ড মেম্বার বলেন, ‘অভিযুক্তরাই মীমাংসার কথা বলেছিল। এখন জয়নাল ও শুক্কুর কই আছে আমার জানা নাই।’
কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা নির্যাতনে গৃহবধূর মৃত্যু হলেও এটিকে অপমৃত্যু বলছেন রাজিবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ধর্ষণের কোনও অভিযোগ পাইনি। স্বামী-স্ত্রী বিষপান করেছিল। স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। স্বামীর অবস্থা ভালো। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।’
গৃহবধূকে কয়েক মাস ধরে পালাক্রমে ধর্ষণ ও পাঁচ দিন আগে বিষপানের ঘটনা এলাকায় আলোচিত হলেও তা পুলিশের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি বলে দাবি করেন ওসি। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন কোনও অভিযোগ পাইনি। গৃহবধূর মামা আমাদের বলেছেন বিষপান করেছেন। বিষপানে মৃত্যু হওয়ায় অপমৃত্যু মামলা হয়েছে।’

জনপ্রিয়


অপরাধ থেকে আরও পড়ুন

সিঙ্গাপুর-দুবাইয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য, জহিরুল-মাঝহারুলের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ

স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম এবং তার ভাই মাঝহারুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোনো অনুমোদন ছাড়াই সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে একাধিক কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালনা করছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কিংবা আয় সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নথিতে নেই, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একাত্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত এই তথ্য আগারগাঁওয়ের বিসিএস কম্পিউটার সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত স্মার্ট টেকনোলজিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

ঘাতকের পরিচয় ও হত্যার কারণ নিয়ে যা জানা গেল

ইতালির রাজধানী রোমের পশ্চিমাঞ্চলের কাসালোত্তি এলাকায় একই পরিবারের তিন বাংলাদেশিকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় ৪৩ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক শাহাদাত হোসেনকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে খুঁজছে ইতালির পুলিশ। নিহতরা হলেন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং তাদের আট বছর বয়সী মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশা। হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দম্পতির ২০ বছর বয়সী ছেলে আমির, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রামপুরায় কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি: হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ড

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় একটি ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি করাসহ দুজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড এবং রামপুরা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

হাসিলের নামে কোরবানির হাটে শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি

হাটে ঢোকার আগে টাকা, গরু নামানোর জন্য টাকা, মাটি ভরাট করতে টাকা, আবার বের হতেও লাগবে টাকা। হাসিলের নামে কুরবানির হাটে একদিনেই উঠছে শত কোটি টাকার চাঁদা। এমনই অভিযোগ সামনে এসেছে পুরো দেশের কোরবানির হাট গুলোতে। যেখানে হাটের ভেতর থেকে শুরু করে মহাসড়কের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে যেন অর্থ আদায়ের এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে উঠেছে।