

দেশ চালানো বা সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আট ঘণ্টার স্বাভাবিক চাকরির মতো নয়। গভীর রাতের আলোচনা, ভোরের ব্রিফিং, জরুরি পরিস্থিতি, বৈঠক, ভাষণ এবং দেশ-বিদেশে সফর, সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানদের ব্যস্ততার তালিকা দীর্ঘ। এর মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে, এত ব্যস্ততার মধ্যে বিশ্বনেতারা কতটা ঘুমিয়ে তাদের দায়িত্ব সামলান?
বুধবার (১২ আগস্ট) গালফ নিউজ-এর এক প্রতিবেদনে বিশ্বের কয়েকজন পরিচিত রাজনৈতিক নেতার ঘুমের অভ্যাস তুলে ধরা হয়েছে।
সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির এক মন্তব্যের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তিনি জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন অনেক রাত গেছে, যখন তিনি প্রায় না ঘুমিয়েই কাটিয়েছেন।
গত জুলাইয়ে এক সরকারি ছুটির দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাকাইচি লেখেন, অবশেষে তিনি টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতে পেরেছেন। তাঁর কাছে এটি ছিল বিরল এক আশীর্বাদের মতো। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাঁর স্বাভাবিক রাতের ঘুম ছিল শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা বলে জানান তিনি।
তাকাইচির এই মন্তব্য জাপানে উদ্বেগ তৈরি করে। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অতিরিক্ত কাজের চাপের কারণে দেশটিতে ‘কারোশি’ বা অতিরিক্ত কাজের ফলে মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। তাঁর মন্তব্যের পর বিশ্বজুড়েও প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক নেতাদের কম ঘুম কি তাদের কর্মনিষ্ঠার পরিচয়, নাকি পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে?
বিশ্বের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার নিজেদের বক্তব্য এবং প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তাদের ঘুমের অভ্যাস তুলে ধরা হলো।
সানায়ে তাকাইচি: শূন্য থেকে ৩ ঘণ্টা
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কম ঘুমানো রাজনৈতিক নেতাদের তালিকার অন্যতম চরম উদাহরণ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি রাতে সাধারণত শূন্য থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন।
কোনো ছুটির দিনে টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগকে তিনি ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত আশীর্বাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশের পর জাপানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সংস্কৃতি এবং ‘কারোশি’ নিয়ে আলোচনা নতুন করে সামনে আসে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে কম ঘুমানো মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। ২০১৭ সালে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, সাধারণত রাতে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ঘুমান।
এপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সাধারণত রাত ১২টা বা ১টা পর্যন্ত কাজ করেন এবং ভোর ৫টার মধ্যেই জেগে ওঠেন। নিজের কর্মক্ষমতার ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ঘুমের প্রয়োজন হয়, এমন ধারণাও তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন।
নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তিনি অনেক কম ঘুমান। ২০১৯ সালে বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ঘুমের অভ্যাস নিয়ে কথা বলেন মোদি। তিনি জানান, তাঁর শরীরের জৈবিক চক্র এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে তিনি রাতে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমান। তবে এই অল্প সময়েই তিনি গভীর ও নিশ্চিন্ত ঘুমাতে পারেন বলে জানান।
ইমানুয়েল মাক্রোঁ
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁও কম ঘুমিয়ে কাজ করার জন্য পরিচিত। দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-এর ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বের শুরু থেকেই তীব্র ব্যস্ততার মধ্যে তিনি রাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।
গভীর রাত পর্যন্ত সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং কাজের ফাইল পর্যালোচনা করার অভ্যাসও তাঁর ছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বারাক ওবামা
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও হোয়াইট হাউসের সময়কালে রাতে কাজ করা নেতাদের একজন ছিলেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ২০১৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওবামা সাধারণত রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ঘুমাতেন।
পরিবারের সঙ্গে রাতের খাবার শেষ করার পর তিনি কয়েক ঘণ্টা একা কাজ করতেন। এ সময় নথি পর্যালোচনা, ব্রিফিং পেপার পড়া, লেখালেখি এবং পরের দিনের প্রস্তুতি নিতেন। দিনের ব্যস্ততা শেষে গভীর রাতের নিরিবিলি সময়টি তাঁর কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
আঙ্গেলা মেরকেল
জার্মানির সাবেক চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল কাজের চাপের সময়ে ঘুমের ঘাটতি সামলানোর নিজের সক্ষমতার কথা বলেছিলেন। তিনি এ ক্ষেত্রে নিজেকে ‘উটের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেরকেল জানিয়েছিলেন, কাজের চাপ বেশি থাকলে তিনি টানা কয়েক দিন মাত্র কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে পারেন। তবে পরে সুযোগ পেলে সেই ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে হয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ, তিনি স্থায়ীভাবে কম ঘুমানোর দাবি করেননি। বরং সাময়িকভাবে ঘুমের ঘাটতি সামলে পরে তা পূরণ করার বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন।
মার্গারেট থ্যাচার
স্মার্টফোন, ২৪ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম এবং সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক যোগাযোগের যুগের আগেই কম ঘুমিয়ে কাজ করার উদাহরণ তৈরি করেছিলেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার।
‘আয়রন লেডি’ নামে পরিচিত এই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রাতে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমানোর কথা নিজেই জানিয়েছিলেন। ১৯৮৯ সালে দ্য সান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর পক্ষে চার ঘণ্টার বেশি ঘুমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁর সাবেক প্রেস সচিব স্যার বার্নার্ড ইনঘামও পরে নিশ্চিত করেন, থ্যাচার রাতে প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমাতেন।
কম ঘুম কি সত্যিই সুবিধা দেয়?
রাজনৈতিক অঙ্গনে কম ঘুমিয়ে কাজ করাকে অনেক সময় সহনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তবে ঘুম বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।
গবেষণায় দেখা গেছে, অত্যন্ত অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিকভাবে কম ঘুমানোর পেছনে জিনগত বৈশিষ্ট্য ভূমিকা রাখতে পারে। তারা কম ঘুমিয়েও স্বাভাবিকভাবে কার্যক্রম চালাতে সক্ষম হন। তবে এ ধরনের মানুষ অত্যন্ত বিরল।
সাধারণ পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য নিয়মিত কম ঘুমানো কোনো সুবিধার বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেয়। পর্যাপ্ত ঘুম মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বনেতাদের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি কেবল তারা কতক্ষণ জেগে থাকতে পারেন, তা নয়। কোটি কোটি মানুষের জীবন ও ভাগ্য নির্ধারণকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে তাদের মনোযোগ, বিচারবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা কতটা প্রভাবিত হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।







