সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। কোথাও যোগ্য ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগের অভিযোগ করা হয়েছে, আবার কোথাও একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে ডিলারশিপ দেওয়ার সুপারিশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যবসায়ীরা।
চুয়াডাঙ্গায় নতুন নিয়োগ পাওয়া ৪৫ জন বিসিআইসি সার ডিলারের মধ্যে ৪২ জন বিএনপির নেতাকর্মী ও তাঁদের স্বজন বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, খুলনার ডুমুরিয়া ও লক্ষ্মীপুরে ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাতক্ষীরায় বিতর্কিত নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
চুয়াডাঙ্গা ও দামুড়হুদায় নতুন নিয়োগ পাওয়া সার ডিলারদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর দুই সংসদ সদস্য মাসুদ পারভেজ রাসেল ও মো. রুহুল আমিন।
বুধবার জেলা জামায়াতের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় ডিলার নিয়োগের দাবি জানান তাঁরা।
জামায়াতের নেতাদের অভিযোগ, যোগ্য ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তাঁরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার জেলা প্রশাসক লুৎফুন নাহার বলেন, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ মিথ্যা। উপজেলা পর্যায়ের কমিটি যাচাই-বাছাই করে সুপারিশ দেওয়ার পর নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের তদন্ত নিয়েও অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ী পঙ্কজ কুমার মণ্ডল জেলা প্রশাসক ও জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির কাছে লিখিত আবেদন করে নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
পঙ্কজ কুমার মণ্ডলের ভাষ্য, গত ২ সেপ্টেম্বর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তিনি আবেদন করেন। ১০ সেপ্টেম্বর উপজেলা থেকে তিন কর্মকর্তা তাঁর কাগজপত্র ও গুদাম পরিদর্শন করেন। ওই ইউনিয়নে ১১ জনের গুদাম পরিদর্শন করা হলেও শেষ পর্যন্ত ডিলার নিয়োগ পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম হালদার।
পঙ্কজের অভিযোগ, যোগ্যতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান খান মিন্টুর স্ত্রী লায়লাতুন্নাহারকে ডিলার নিয়োগ এবং সিমেন্টের দোকানে ‘জারিফ এন্টারপ্রাইজ’ নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে সেটিকে বিক্রয়কেন্দ্র হিসেবে দেখানোর অভিযোগও রয়েছে।
এ ছাড়া সদর ইউনিয়নের ডিলার গাজী হাফিজুর রহমান গুটুদিয়ার একটি বরফকলকে গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মাগুরখালীতে আওয়ামী লীগ নেতা সুকৃতি মণ্ডলের মিষ্টির দোকানে সার বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙানো এবং আটলিয়ায় বিএনপি নেতা আবদুল মালেক সরদারের ডিলারশিপ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
ডুমুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, আবেদনে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরেজমিন পরিদর্শনের তথ্যের কোনো গরমিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভুল তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ডিলারশিপ বাতিল করা হবে।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় ইফাজ এগ্রোকে সার ডিলার নিয়োগের সুপারিশ নিয়েও অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান ও ইয়াছিনুর রহমান। তাঁরা জেলা প্রশাসক ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এ বিষয়ে অভিযোগ জমা দিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিতে মুরগি, মাছ ও গরুর খাদ্য বিক্রি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেনের ভাই ইকবাল হোসেনও বিএডিসির সার ডিলার। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ২৫ টন সার ধারণক্ষমতার জায়গা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে সুপারিশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের। প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় একতরফাভাবে সুপারিশ পাওয়ার বিষয়টিও তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
চন্দ্রগঞ্জ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ থাকা বাহার উদ্দিনের ডিলার নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে ইফাজ এগ্রোর স্বত্বাধিকারী জাকির হোসেন বলেন, বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তিনি আবেদন করেছেন এবং অন্য কেউ আবেদন করেননি। তাঁর দাবি, সার ও পশুখাদ্যের দোকান আলাদা। এ ছাড়া তাঁর ভাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নয়, বিএডিসির ডিলার।
লক্ষ্মীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জহির আহমেদ বলেন, এখনো চূড়ান্ত নিয়োগ হয়নি। সুপারিশের প্রক্রিয়া চলছে।
এদিকে, সাতক্ষীরার ৭৮টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বুধবার দুপুরে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
কর্মসূচিতে বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রকৃত ব্যবসায়ী ও যোগ্য ব্যক্তিদের বঞ্চিত করে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কৃষকেরা সময়মতো এবং ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারেন। তাঁরা বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন করে ডিলার নিয়োগের দাবি জানান।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বঞ্চিত করে একটি গোষ্ঠীর তৈরি তালিকার ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ডিলারশিপ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাব খাটিয়ে নিকটাত্মীয়, স্ত্রী, সন্তান ও শ্যালক-শ্যালিকার নামে একাধিক ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এবং সার ব্যবসা বা কৃষির সঙ্গে আগে যুক্ত ছিলেন না, এমন ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগের অভিযোগও তোলেন তাঁরা।
সাতক্ষীরা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে এবং পৌর বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান ভুট্টো ও সদস্যসচিব শেখ শরিফুজ্জামান সজীবসহ অন্য নেতারা।
বিভিন্ন জেলায় সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাই ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।








