জমি কেনার আগে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির কাগজপত্র যাচাই করতে গিয়ে অনেকেই খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বর নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। জমি শনাক্ত করা এবং মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিটির কাজ আলাদা। তাই জমি কেনাবেচার আগে এসব নথির পার্থক্য জানা জরুরি।
খতিয়ান কী?
খতিয়ান হলো ভূমি জরিপের মাধ্যমে প্রস্তুত করা জমির স্বত্বলিপি বা রেকর্ড। এতে জমির মালিক বা স্বত্বসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, জমির শ্রেণি এবং একাধিক মালিক থাকলে তাঁদের অংশের বিবরণ থাকতে পারে।
জমির রেকর্ডে কার নাম রয়েছে, কোন দাগে কতটুকু জমি আছে এবং একাধিক ব্যক্তির মধ্যে কার কতটুকু অংশ রয়েছে, তা যাচাই করতে খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে খতিয়ানে কারও নাম থাকলেই সব ক্ষেত্রে তাঁর চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। জমির দলিল, উত্তরাধিকার বা হস্তান্তরসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণও যাচাই করতে হয়।
পর্চা কী?
পর্চা বলতে সাধারণত খতিয়ানের অনুলিপি বা কপিকে বোঝানো হয়। ভূমি জরিপের সময় যাচাইয়ের জন্য সরবরাহ করা খসড়া রেকর্ডের অনুলিপিকে মাঠ পর্চা বলা হয়। অন্যদিকে, চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের অনুলিপিও পর্চা হিসেবে পরিচিত।
অর্থাৎ, খতিয়ান হলো জমির রেকর্ড, আর পর্চা হলো সেই রেকর্ডের অনুলিপি বা জরিপের নির্দিষ্ট পর্যায়ে সরবরাহ করা নথি।
জমি কেনাবেচা, সরকারি ভূমিসেবা গ্রহণ এবং জমির রেকর্ডসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ে পর্চা কাজে লাগে। তবে পর্চাটি কোন জরিপের, সেটি খসড়া নাকি চূড়ান্ত রেকর্ডের অনুলিপি এবং তা সত্যায়িত কি না, এসব বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
দাগ নম্বর কী?
জরিপের সময় একটি মৌজার জমিকে পৃথক পৃথক ভূমিখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মৌজা নকশায় এসব ভূমিখণ্ড শনাক্ত করতে যে নম্বর দেওয়া হয়, সেটিই দাগ নম্বর।
সহজভাবে বললে, খতিয়ান থেকে জমির রেকর্ড ও স্বত্বসংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। আর দাগ নম্বর দিয়ে মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
তবে শুধু দাগ নম্বর জানলেই জমির মালিকের নাম কিংবা বিক্রেতার আইনগত অধিকার নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ জন্য খতিয়ান, দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা জরুরি।
একই জমির দাগ নম্বর কি বদলাতে পারে?
হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে নতুন জরিপ হলে পুরোনো দাগ নম্বরের সঙ্গে নতুন দাগ নম্বরের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। জমি বিভক্ত হওয়া, একাধিক ভূমিখণ্ড একত্র করা কিংবা জরিপের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে দাগ নম্বরে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
তাই পুরোনো দলিলের দাগ নম্বরের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের নম্বর না মিললেই জমিটি আলাদা—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট মৌজা, জরিপের ধরন, সাবেক ও হাল দাগের সম্পর্ক এবং মৌজা নকশা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান কী?
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত ভূমি জরিপের ভিত্তিতে প্রস্তুত রেকর্ডগুলো সাধারণভাবে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএস খতিয়ান নামে পরিচিত।
সিএস খতিয়ান হলো ক্যাডাস্ট্রাল জরিপের রেকর্ড। এসএ খতিয়ান জমিদারি অধিগ্রহণ-পরবর্তী ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। আরএস খতিয়ান সংশোধনী জরিপের রেকর্ড। অন্যদিকে, বিএস খতিয়ান বাংলাদেশ সার্ভে নামে পরিচিত জরিপের রেকর্ড।
একই জমির একাধিক জরিপের খতিয়ান থাকতে পারে। পরবর্তী জরিপে আগের রেকর্ডের তথ্য সংশোধিত বা পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তাই শুধু খতিয়ানের ধরন দেখে কোন রেকর্ডটি প্রযোজ্য, তা নির্ধারণ করা উচিত নয়। জমির অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট জরিপের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
জমি কেনার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
জমি কেনার সময় শুধু বিক্রেতার দেওয়া খতিয়ান বা পর্চার ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। নিরাপদ থাকতে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি।
দলিলে উল্লেখ করা মৌজার নাম, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন।
বিক্রেতার মালিকানার দলিল এবং আগের মালিকদের কাছ থেকে স্বত্ব পাওয়ার ধারাবাহিকতা যাচাই করুন।
একাধিক মালিক থাকলে বিক্রেতা কতটুকু জমি বিক্রির অধিকার রাখেন, তা নিশ্চিত করুন।
মৌজা নকশা অনুযায়ী জমির অবস্থান ও সীমানা সরেজমিনে মিলিয়ে দেখুন।
নামজারি, ভূমি উন্নয়ন করের নথি এবং জমি নিয়ে কোনো মামলা বা বিরোধ রয়েছে কি না, তা যাচাই করুন।
নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের নথি সহায়ক হলেও এগুলো একা জমির মালিকানা প্রমাণের বিকল্প নয়। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন, সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস বা ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
অনলাইনে খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য কোথায় পাবেন?
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সরকারি ওয়েবসাইট settlement.gov.bd-এ খতিয়ান অনুসন্ধান ও মৌজা ম্যাপ দেখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে চলমান জরিপের রেকর্ড খসড়া হতে পারে। তাই জমির বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট চূড়ান্ত রেকর্ড এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সত্যায়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা জরুরি।
খতিয়ান, পর্চা ও দাগ নম্বরের মূল পার্থক্য
খতিয়ান জমির রেকর্ড ও স্বত্বসংশ্লিষ্ট তথ্য জানায়। পর্চা হলো সেই রেকর্ডের অনুলিপি বা নির্দিষ্ট জরিপপর্যায়ে সরবরাহ করা কপি। আর দাগ নম্বর মৌজা নকশায় নির্দিষ্ট জমির অবস্থান শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
জমির পরিচয় ও মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তাই একটি নথির ওপর নির্ভর না করে খতিয়ান, পর্চা, দাগ নম্বর, দলিল, নামজারি, দখল এবং জমির বাস্তব সীমানা মিলিয়ে দেখা সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।







