জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি ও পাসপোর্ট পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জালিয়াতির চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জালিয়াতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা, সাময়িক বরখাস্ত ও গ্রেফতারের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানিয়েছেন, এনআইডি সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। অপরাধে জড়িতদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেছেন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, নাম পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি, ভুয়া উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া কিংবা জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্টের তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে। এ কারণে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র যাচাই না করে কোনো সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। আবেদনকারীদের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জমা দিতে হচ্ছে।
সম্প্রতি এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের এক অফিস সহকারীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে কমিশন।
সংশোধনের আবেদনে যেসব অসংগতি
ইসি কর্মকর্তাদের মতে, অনেক আবেদনে বাবা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর কিংবা মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর দেখানো হচ্ছে। কারও কারও একাধিক জন্মনিবন্ধন বা শিক্ষাগত সনদও পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই না করে সংশোধন করা হলে ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, বিদেশি নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এনআইডি তৈরির অভিযোগও পাওয়া যায়। তাই প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে তদন্ত ও পর্যালোচনা করা জরুরি।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, কিছু আবেদনকারী আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জন্মতারিখ সংশোধন করতে চান। উদাহরণ হিসেবে, কেউ ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করে ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। পরে জন্মসাল ২০০২ করার আবেদন করলে নিবন্ধনের সময় তার বয়স দাঁড়ায় ১৩ বছর। এ ধরনের অসংগতিপূর্ণ আবেদন অনুমোদন করা সম্ভব নয়।
কোন নথি যাচাই করা হয়
ইসি কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ সাধারণ সংশোধন উপজেলা পর্যায়েই সম্পন্ন করা যায়। তবে নাম, বাবা-মায়ের নাম ও জন্মতারিখের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে পরিবর্তনের আবেদন জটিল হওয়ায় তা উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। এসব ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ প্রাসঙ্গিক নথিপত্র যাচাই করা হয়।
পিতার নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পিতার এনআইডি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। শুধু হলফনামার ভিত্তিতে এ ধরনের সংশোধন করা হয় না। আবেদনকারীর দাবির যথার্থতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রমাণ চাওয়া হয়।
সংশোধন নিয়ে ভোগান্তির অভিযোগ
এনআইডি সংশোধন করতে আসা কয়েকজন আবেদনকারী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
এক আবেদনকারী জানান, স্ত্রীর নাম সংশোধনের জন্য ছয় মাস আগে আবেদন করেন তিনি। আবেদনের সময় স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন থাকার বিষয়টি জানানো হয়। একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে আসার পরও ভাই-বোনের প্রত্যয়নপত্র, বায়োমেট্রিক তথ্যসহ আরও কিছু নথি জমা দিতে বলা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পারায় এখনো সংশোধন সম্পন্ন হয়নি।
১৩ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি আবেদন বাতিল
ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত জমা পড়া ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি সংশোধন আবেদনের মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন বাতিল করা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় তথ্য, জন্মসনদ বা গ্রহণযোগ্য নথিপত্র না থাকায় অনেক আবেদন বাতিল হয়েছে। তবে আবেদন বাতিল হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে পুনরায় আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বাতিলের সংখ্যা মানেই এতজন আলাদা আবেদনকারী নন। একজন ব্যক্তি একাধিকবার আবেদন করতে পারেন। একই আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে একটি অনুমোদিত হলেও অন্যটি বাতিল হতে পারে। উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায় পর্যন্ত আবেদন বাতিলের পরও সচিব পর্যায়ে আপিলের সুযোগ রয়েছে।
প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধনে বিশেষ উদ্যোগ
প্রবাসীদের এনআইডি-সংক্রান্ত সেবা সহজ ও দ্রুত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যেসব আবেদনকারীর কাগজপত্র সঠিক, তাদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন ও এনআইডির তথ্যের মধ্যে অমিল থাকলে যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি হয়। বিশেষ করে বয়সের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে কেউ কেউ জন্মতারিখ বা অন্যান্য তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। পরে এসব অসংগতি সংশোধন করতে গিয়ে আরও সমস্যায় পড়েন।
প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা সহজ করতে বিভিন্ন দূতাবাসেও কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। তবে আবেদনকারীর পরিচয় ও নথিপত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে ইসি।
কোন সংশোধন সহজ, কোনটি জটিল
নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য, নাগরিকেরা যেন ভোটার নিবন্ধনের সময় সঠিক তথ্য দেন এবং পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। তবে ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের কারণে বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন কিংবা ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয় নির্ধারিত নিয়মে সংশোধন করা যায়।
অন্যদিকে নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় ও জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা হয়। জালিয়াতি ও ভুয়া পরিচয় প্রতিরোধে এসব বিষয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।








