উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে মেধাবী তরুণদের স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আলেম ও দাঈ শায়খ আহমাদুল্লাহ। তাঁর মতে, উন্নত জীবনের আকর্ষণের পাশাপাশি দেশের কর্মসংস্থান, দুর্নীতি, নিরাপত্তাহীনতা ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের অভাব তরুণদের দেশ ছাড়তে উৎসাহিত করছে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব বিষয় তুলে ধরেন। সেখানে স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার পর এক তরুণের উচ্ছ্বাসের ঘটনা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এই আনন্দ কি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাওয়ার, নাকি উন্নত দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ খুলে যাওয়ার?

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, প্রতি বছর হাজার হাজার মেধাবী তরুণ উচ্চশিক্ষার জন্য উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং সেখানে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ে তুলছেন। অনেক দেশ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ ও স্থায়ী বসবাসের পথও তৈরি করে দিচ্ছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়ছে।

তাঁর মতে, জ্ঞান ও গবেষণার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া দোষের কিছু নয়। তবে দেশের মানুষের অবদান ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় শিক্ষিত হওয়ার পর শুধু উন্নত জীবনযাপনের আশায় স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যাওয়া নিয়ে ভাবার অবকাশ রয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেকের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসে। একপর্যায়ে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কেউ কেউ দেশের সম্পদ বিক্রি করে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। এতে দেশের সঙ্গে তাঁদের শেষ সম্পর্কটুকুও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

তরুণদের দেশত্যাগের জন্য শুধু তাঁদের ভোগবাদী মানসিকতাকে দায়ী না করে রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, স্বাধীনতার এত বছর পরও দুর্নীতিমুক্ত, নিরাপদ, স্থিতিশীল ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে—এমন একটি দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, দেশে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। ঘুষ ও সুপারিশ ছাড়া চাকরি পাওয়া কঠিন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়ম রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নৈতিক অবক্ষয় ও অস্থিরতা তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো যখন মেধাবীদের বিভিন্ন সুযোগ দিয়ে আকৃষ্ট করছে, তখন তাঁদের দেশে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তবে প্রতিকূলতার কারণে তরুণদের হাল ছেড়ে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এই আলেম। তাঁর মতে, সবাই যদি নিরাপদ ও নিরুপদ্রব জীবনের আশায় বিদেশে চলে যান, তাহলে দেশের পরিবর্তন আনবে কে? তরুণদের এমন আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, যার জন্য তাঁরা প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত থাকবেন।

মেধা পাচার রোধে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গবেষণার বরাদ্দ বাড়ানো এবং প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা।

শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, একটি দেশের উন্নয়ন অনেকাংশেই নির্ভর করে তরুণদের মেধা ও দক্ষতার ওপর। সেই মেধা যদি দেশের বাইরে চলে যায় এবং অন্য দেশের উন্নয়নে কাজে লাগে, তাহলে নিজ দেশের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই মেধাবীদের দেশে ধরে রাখতে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।