খেলাধুলা
মেসির সাথে প্রতারণা, কৌশলগত ভুলেই শিরোপা হারাল আর্জেন্টিনা

শেষ বাঁশি বাজার পর একদিকে উল্লাসে মেতে উঠেছে স্পেন, অন্যদিকে মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে চোখের জল মুছছেন লিওনেল মেসি। গ্যালারিতে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক তখনও তার নাম ধরে গান গাইছেন। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সী কিংবদন্তির মুখে তখন আনন্দের ছিটেফোঁটাও নেই—শুধুই বিষণ্নতা, হতাশা আর এক অদ্ভুত শূন্যতা।
সম্ভবত বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির শেষ উপস্থিতির সবচেয়ে প্রতীকী মুহূর্ত ছিল সেটিই।
ফাইনালের পর মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও। তিনি জানান, এ বিষয়ে অধিনায়কের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। কথা বলতে বলতেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে বেরিয়ে যান স্কালোনি।
মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ার আসলে নিজেকে বারবার বদলে নেওয়ার এক অনন্য গল্প। ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেকের পর সময়ের সঙ্গে অন্তত পাঁচবার নিজের খেলার ধরন ও ভূমিকা বদলেছেন তিনি। তরুণ ড্রিবলার থেকে প্লেমেকার, তারপর গভীর থেকে খেলা নিয়ন্ত্রণকারী নেতা—প্রতিটি ভূমিকাতেই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন মেসি।
এবারের বিশ্বকাপেও ৩৯ বছর বয়সী মেসি দেখিয়েছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু ফাইনালে সেই মেসিকে যেন খুঁজেই পাওয়া গেল না।
ভুল কৌশলেই বিচ্ছিন্ন মেসি
ফাইনালের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা বেছে নেয় আক্রমণাত্মক ও শারীরিক লড়াইনির্ভর ফুটবল। কিন্তু এই কৌশল শেষ পর্যন্ত দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
মেসি সাধারণত বল পায়ে নিয়ে আক্রমণের ছন্দ তৈরি করেন, সতীর্থদের সঙ্গে ছোট পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙেন এবং সঠিক মুহূর্তে শেষ পাসটি দেন। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার পরিকল্পনায় সেই মেসিকে বল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা কিংবা সময়—কোনোটিই তৈরি হয়নি।
ফলাফল? পুরো ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা একটি শটও নিতে পারেনি।
স্পেন তখন ছিল ছন্দময়, নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত। বিপরীতে আর্জেন্টিনা বারবার জড়িয়ে পড়েছে ফাউল, উত্তেজনা ও অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষে। ম্যাচের শুরুতে দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কঠিন ফাউল নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। সেই ঘটনার পর রেফারিং নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এবং গ্যালারি থেকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানও শোনা যায়।
ফুটবলের বদলে উত্তেজনায় ডুবে গেল আর্জেন্টিনা
ম্যাচ যত গড়িয়েছে, আর্জেন্টিনার হতাশা ততই স্পষ্ট হয়েছে। এনজো ফার্নান্দেজের অপ্রয়োজনীয় আগ্রাসী আচরণ, দ্বিতীয় হলুদ কার্ড এবং শেষ বাঁশির পর দুই দলের খেলোয়াড়দের হাতাহাতি—সব মিলিয়ে ফাইনালের সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
বদলি খেলোয়াড় লেয়ান্দ্রো পারেদেসও একাধিক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। অথচ এই সময় আর্জেন্টিনার প্রয়োজন ছিল ঠান্ডা মাথায় খেলায় ফিরে আসা। কিন্তু মাঠের উত্তেজনাই যেন দলটির কৌশল ও মনোযোগকে গ্রাস করে নেয়।
৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা
পরিসংখ্যানই আর্জেন্টিনার ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো শট নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। বিপরীতে স্পেনের অন-টার্গেট শট ছিল ১২টি।
অতিরিক্ত সময়ের ১১৭তম মিনিটে মেসির সামনে একটি সুযোগ এসেছিল। কিন্তু তার শটও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
আরও একটি পরিসংখ্যান আর্জেন্টিনার কৌশলগত ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে। প্রথমার্ধে প্রতিপক্ষের শেষ তৃতীয়াংশে আর্জেন্টিনার পাস ছিল আটটি, অথচ একই অঞ্চলে তারা ফাউল করেছে নয়টি।
অর্থাৎ, আর্জেন্টিনা যেখানে আক্রমণ তৈরি করার কথা ছিল, সেখানে তারা বেশি ব্যস্ত ছিল শারীরিক লড়াইয়ে।
মেসির শেষ বিশ্বকাপ?
শেষ বাঁশির পর সতীর্থদের সঙ্গে চোখের জল ভাগ করে নেন মেসি। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার ৩৪তম ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন উঠছে—বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এটাই কি ছিল আর্জেন্টাইন মহাতারকার শেষ অধ্যায়?
শিরোপা দিয়ে বিদায় নেওয়া হয়নি মেসির। তবে একটি ফাইনালের ব্যর্থতা তার উত্তরাধিকার মুছে দিতে পারে না।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে তার প্রভাব, অসংখ্য রেকর্ড এবং শিল্পের মতো ফুটবল—সব মিলিয়ে লিওনেল মেসি ইতোমধ্যেই নিজেকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তবু এই ফাইনাল হয়তো আর্জেন্টিনার জন্য একটি বড় শিক্ষা হয়ে থাকবে—মেসির মতো একজন খেলোয়াড়কে মাঠে রেখেও যদি তাকে খেলানোর কৌশল না থাকে, তাহলে সবচেয়ে বড় মঞ্চেও প্রতিভা একা দলকে শিরোপা এনে দিতে পারে না।
জনপ্রিয়
খেলাধুলা থেকে আরও পড়ুন
প্রাইভেট জেট ব্যবহার করে খেলা দেখতে গিয়ে পৃথিবীর বিশাল ক্ষতি করেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট
বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে একের পর এক প্রাইভেট জেট ব্যবহার করে পরিবেশের ওপর ব্যাপক ক্ষতি করেছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো—এমন অভিযোগ উঠেছে। জার্মান সাময়িকী ‘ডার স্পাইজেল’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চলতি বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন ম্যাচে উপস্থিত হতে ইনফান্তিনো প্রাইভেট জেটে যে দূরত্ব পাড়ি দিয়েছেন, তা পৃথিবীকে দুবার প্রদক্ষিণ করার সমান।

বিশ্বকাপ ফাইনালে ট্রাম্প-মামদানি, কে কোন দলকে সমর্থন করছেন?
বিশ্বকাপের ফাইনালে একই গ্যালারিতে দেখা যাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানিকে। রাজনীতিতে বিপরীত মেরুর এই দুই নেতার আলাদা করে সাক্ষাতের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন মেয়রের মুখপাত্র।

বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির মুখোমুখি হওয়া নিয়ে যা বলেছিলেন ইয়ামাল
আগামী ১৯ জুলাই ফুটবল বিশ্ব দেখতে যাচ্ছে এক রূপকথার ফাইনাল। বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন ও কোপা আমেরিকার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।

তিনবার ফাইনালে, একবার শিরোপা, তবু প্রশ্ন থামছে না মেসিকে নিয়ে
ইতিহাসে আর কোনো ফুটবলার অধিনায়ক হিসেবে তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার কীর্তি গড়তে পারেননি, লিওনেল মেসি সেটা করে দেখিয়েছেন ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে। ২০০৬ সালে কিশোর বয়সে যে ছেলেটিকে দিয়েগো ম্যারাডোনার উত্তরসূরি বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, প্রায় দুই দশক পর সেই মেসিই এখন নিজের নামে লিখে ফেলছেন একের পর এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড। অথচ এই পথটা কখনোই মসৃণ ছিল না।









