বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একই মহল্লা থেকে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের দুজন বিএনপির এবং একজন জামায়াতে ইসলামীর। বিএনপির দুই মনোনয়নপ্রত্যাশীর একজন সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন সান্টু, অন্যজন বরিশাল সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলালের নাম।

তিন নেতার বাসা নগরীর প্রাণকেন্দ্র ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায়। তাঁদের বাসার মধ্যে দূরত্ব সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ গজ। একই মহল্লায় তিন প্রভাবশালী নেতার অবস্থান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিএনপির সমর্থকদের পড়তে হচ্ছে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। একদিকে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, অন্যদিকে নিজ দলের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য—দুজনের মধ্যে কাকে সমর্থন করবেন, তা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন অনেকে।

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। তবে বরিশালে এরই মধ্যে নির্বাচনি তৎপরতা শুরু হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।

জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে তাঁকে প্রার্থী করেছিল দলটি। তবে চরমোনাই পীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে আসনটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। ফলে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও পরে তা প্রত্যাহার করেন হেলাল। বরিশালের রাজনীতিতে পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় এই নেতাকে এবার মেয়র পদে বিএনপির সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

হেলালের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মেয়র পদে অ্যাডভোকেট শেখ আব্দুল্লাহ নাসির এবং এনসিপি এম আনোয়ার হোসেন সিকদারকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা রয়েছে নারী নেত্রী ড. মনীষা চক্রবর্তীর।

অন্যদিকে, বিএনপির মনোনয়ন পেতে এক ডজনের বেশি নেতা তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বরিশাল-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরদার সরফুদ্দিন সান্টু, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতউল্লাহ ও এবায়েদুল হক চান এবং দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিন।

এ ছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক, সদস্যসচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন, মহানগর বিএনপির এক নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান নান্টু এবং মহানগর বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মীর জাহিদুল কবির।

এই মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে কে চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একই মহল্লা থেকে সান্টু, শিরিন ও হেলালের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিন নেতারই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায়।

সান্টু ও হেলাল উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়িতে বসবাস করেন। শিরিনের স্বামীর বাড়ি বাগেরহাটে হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি বাবার বাড়িতে থাকেন। নগরীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত ব্রাউন কম্পাউন্ডে তাঁদের বাসা একে অপরের খুব কাছাকাছি। একসময় স্বামী বোরহান রেজার বরিশাল জেলা পুলিশে কর্মরত থাকার সময় শিরিন নিজের এলাকায় থাকার জন্য সান্টুর বাসায় ভাড়াটিয়া হিসেবেও ছিলেন। হেলালের বাড়ি থেকে শিরিনের বাবার বাড়ি খালি চোখেই দেখা যায়। আবার এই দুই নেতার বাসা থেকে সান্টুর বাড়িতে যেতে সময় লাগে মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট।

সম্প্রতি নগরজুড়ে সংসদ সদস্য সরদার সরফুদ্দিন সান্টুর বিলবোর্ড ও পোস্টার লাগানোর পর তাঁর মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে সান্টু জানান, এর আগে তিনি একবার মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন। তাঁর দাবি, ওই নির্বাচনে তাঁকে জোর করে হারানো হয়েছিল এবং কয়েকশ ভোটের ব্যবধানে তাঁর জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

মেয়র পদে দলের মনোনয়ন চাইবেন কি না, জানতে চাইলে সান্টু বলেন, এটি দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত। তিনি মনোনয়ন দিলে অবশ্যই মেয়র পদে নির্বাচন করবেন।

একই মহল্লা থেকে তিন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে জানতে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জামায়াতের প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসাইন হেলাল বলেন, একই পরিবারের দুই ভাইও একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ভোটাররা বুঝেশুনেই যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেন। বিএনপি যদি ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকা থেকে প্রার্থী দেয়, তাহলে এলাকার মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে