ফুটবল


মার্টিনেজের রেকর্ড ১০ সেভ, এনজোর লাল কার্ড, অতিরিক্ত সময়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল


নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:১৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:২১ অপরাহ্ন, রবিবার

মার্টিনেজের রেকর্ড ১০ সেভ, এনজোর লাল কার্ড, অতিরিক্ত সময়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে একাই যেন আর্জেন্টিনাকে টিকিয়ে রাখলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে রেকর্ড ১০টি সেভ করেন তিনি। তবে ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখায় ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা না পাওয়ায় শিরোপা নির্ধারণ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

 

প্রথমার্ধের ধারাবাহিকতাই বজায় ছিল দ্বিতীয়ার্ধেও। হাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত পুরো মাঠজুড়ে আধিপত্য দেখায় স্পেন। বলের দখল, আক্রমণ, লক্ষ্যে শট এবং আর্জেন্টিনার ওপর চাপ সৃষ্টি, প্রতিটি বিভাগেই এগিয়ে ছিল লা রোজা। গোল না পেলেও তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছে পুরো সময়।

 

ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই প্রথম বড় সুযোগ পায় স্পেন। লামিন ইয়ামালের ক্রস ডিফ্লেক্ট হয়ে পৌঁছে যায় দানি ওলমোর কাছে। ওলমো আবার ইয়ামালকে বল ফিরিয়ে দিলে নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় বল জালে যেতে পারেনি।

 

শুরুর দিকে দুই দলই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও খেলার নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের দখলে। মিকেল ওয়ারজাবালকে ম্যাক অ্যালিস্টারের চ্যালেঞ্জে ফেলে দেওয়া হলে স্পেন ফাউলের আবেদন জানায়। তবে রেফারি স্লাভকো ভিনসিক খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

 

অন্যদিকে সপ্তম মিনিটে লিওনেল মেসির সামনে তৈরি হওয়া সম্ভাবনাময় সুযোগ নষ্ট করে দেন স্পেন গোলরক্ষক উনাই সিমন। দ্রুত লাইন ছেড়ে বেরিয়ে এসে তিনি আর্জেন্টিনাকে গোল থেকে বঞ্চিত করেন।

 

প্রথম ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা বলের দখল রাখতে পারে মাত্র ৩২ শতাংশ। এ সময় লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে মাত্র ১৭ বার বলে স্পর্শ করেন। স্পেনের উচ্চ প্রেসিংয়ে আর্জেন্টিনা নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পায়নি।

 

স্পেনের অধিনায়ক রদ্রি পুরো ম্যাচজুড়েই মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। প্রয়োজনে তৃতীয় সেন্টার-ব্যাকের ভূমিকায় নেমে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি আক্রমণেও কার্যকর ভূমিকা রাখেন তিনি।

 

৩৯তম মিনিটে লাপোর্তে, রদ্রি ও আলেক্স বায়েনার চমৎকার পাস আদান-প্রদানের পর ফাবিয়ান রুইজ বল বাড়ান ওয়ারজাবালের দিকে। বক্সের প্রান্ত থেকে তার শক্তিশালী বাঁ পায়ের শট দুর্দান্ত দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

 

৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে ম্যাচের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ইনজুরির কারণে দুই মিনিট পর মাঠ ছাড়েন তিনি। তার জায়গায় নামেন নিকোলাস ওতামেন্দি। একই সময় কুকুরেয়ার একটি প্রচেষ্টা অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়।

 

প্রথমার্ধ শেষে বলের দখলে স্পেন এগিয়ে ছিল ৬৫-৩৫ শতাংশ ব্যবধানে। আর্জেন্টিনার ১৫৫টি সফল পাসের বিপরীতে স্পেন সম্পন্ন করে ৩১৩টি পাস। পুরো প্রথমার্ধে লক্ষ্যে তো দূরের কথা, কোনো শটই নিতে পারেনি বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফাইনাল থার্ডেও স্পেন ৩৫ বার প্রবেশ করে, যেখানে আর্জেন্টিনা পারে মাত্র ১৮ বার।

 

বিরতির পর লিওনেল স্কালোনি প্রথম একাদশে থাকা নিকো গঞ্জালেজকে তুলে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামান। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটেই ওয়ারজাবালের পাস থেকে সুযোগ পান আলেক্স বায়েনা। তবে তার দুর্বল শট সহজেই তালুবন্দি করেন মার্টিনেজ।

 

মাঠে নেমেই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন পারেদেস। এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন। এক পর্যায়ে দানি ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

 

৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকলে নিশ্চিত বিপদ থেকে বাঁচে আর্জেন্টিনা। পরের মিনিটে ওলমোর ব্যাকপাস থেকে কুকুরেয়ার সামনে সুযোগ তৈরি হলেও গঞ্জালো মন্তিয়েল সময়মতো ক্লিয়ার করেন। এরপর স্কালোনি মন্তিয়েলের জায়গায় নাহুয়েল মোলিনাকে নামান।

 

৬২ মিনিটে স্পেন ফাবিয়ান রুইজ ও ওয়ারজাবালকে তুলে মাঠে নামায় পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে। দুই মিনিট পর বক্সের বাইরে থেকে ওলমোর শট ঠেকিয়ে দেন মার্টিনেজ। এরপর ইয়ামালের দারুণ ক্রস থেকে ফেরান তোরেস নিচু হেড নিলেও বল যায় আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের হাতেই।

 

১৯৬৬ সালে পরিসংখ্যান সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথম ৭০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। এর আগে এমন দীর্ঘ অপেক্ষার রেকর্ড ছিল ২০২২ সালের ফাইনালে ফ্রান্সের, যারা ৬৮ মিনিট পর্যন্ত লক্ষ্যে শট নিতে পারেনি।

 

৭০ মিনিটে রদ্রিগো দে পল ও ক্রিস্টিয়ান রোমেরোকে তুলে জিউলিয়ানো সিমিওনে এবং ফাকুন্দো মেদিনাকে মাঠে নামান স্কালোনি। ৭৫ মিনিটে স্পেনও দুটি পরিবর্তন আনে। দানি ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো এবং আলেক্স বায়েনার পরিবর্তে নিকো উইলিয়ামস মাঠে নামেন।

 

৭৭ মিনিটে গোল করার মতো অবস্থান থেকে পেদ্রির শট আবারও রুখে দেন মার্টিনেজ। কিছুক্ষণ পর ইয়ামালের প্রচেষ্টা ব্লক করেন মেদিনা। ফিরতি বলে পাও কুবার্সির দূরপাল্লার শটও মার্টিনেজের গায়ে লেগে বাইরে চলে যায়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রস থেকে আইমেরিক লাপোর্তের হেডও নিরাপদে ঠেকান তিনি। ৮৭ মিনিটে ফেরান তোরেসের শট অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে যায়।

 

ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে নিকো উইলিয়ামসের শক্তিশালী শট দুর্দান্ত দক্ষতায় প্রতিহত করেন মার্টিনেজ। এর কিছুক্ষণ পর পাও কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। শেষ মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলে স্পেন বক্সের সামনে ফ্রি-কিক পায়। ইয়ামালের নেওয়া সেই শটও অবিশ্বাস্য সেভে ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ।

 

মার্টিনেজের রেকর্ড ১০ সেভে ম্যাচে টিকে থাকলেও ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে নিয়ে নির্ধারিত সময় শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়। ফলে বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

 
 
 

জনপ্রিয়


ফুটবল থেকে আরও পড়ুন

বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরে স্পেনের দুই ফুটবলারের ওপর কেন চড়াও হলেন পারেদেস?

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর মাঠেই অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিলেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারদেস। ম্যাচ শেষে স্পেনের দুই ফুটবলার এরিক গার্সিয়া ও গাভির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে তাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ফেরান তোরেসের গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন, আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়

স্পেনের আধিপত্যের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারল না বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নিউইয়র্ক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে লা রোজা।

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের দাপট, চাপে থেকে গোলশূন্য প্রথমার্ধ শেষ করল আর্জেন্টিনা

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালের প্রথমার্ধে মাঠজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে স্পেন। বলের দখল, আক্রমণ গঠন, লক্ষ্যে শট এবং পাসিং, প্রতিটি বিভাগেই এগিয়ে ছিল লা রোজা। গোলের দেখা না পেলেও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখে গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল।

বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে আট দল, গোল না হজম করেই অনন্য নজির স্পেনের

চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই নিশ্চিত করেছে আটটি দল। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, গত আসরের রানার্সআপ ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, মরক্কো, বেলজিয়াম এবং স্পেন শেষ আটে জায়গা করে নিয়েছে। তবে এই আট দলের মধ্যে একমাত্র স্পেনই এখন পর্যন্ত পুরো টুর্নামেন্টে একটি গোলও হজম করেনি। দুর্দান্ত রক্ষণভাগের নৈপুণ্যে তারা গড়েছে অনন্য এক রেকর্ড।