ফুটবল
উনিশেই বিশ্বজয়, বুকজুড়ে ফিলিস্তিন—ফুটবলের নতুন প্রজন্মের প্রতীক লামিন ইয়ামাল

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তখন ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচিত হচ্ছে। প্রায় ৮০ হাজার দর্শকের সামনে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াই শেষে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় স্পেন। মাঠজুড়ে লাল জার্সিধারীদের উচ্ছ্বাস, আর সেই উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে মাত্র ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল। বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে তিনি যেন নতুন এক যুগের সূচনার প্রতীক।
অন্য প্রান্তে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের মঞ্চে হয়তো এটাই ছিল আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়। ম্যাচ শেষে আবেগঘন এক মুহূর্তে ইয়ামাল এগিয়ে গিয়ে আলিঙ্গন করেন নিজের শৈশবের নায়ককে। অনেকের চোখে সেটিই ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের হাতে ফুটবলের নেতৃত্ব হস্তান্তরের প্রতীকী দৃশ্য।
এই গল্পের শুরু প্রায় দুই দশক আগে। ২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের ফটোশুটে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুর সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন তখনকার তরুণ লিওনেল মেসি। একটি নীল প্লাস্টিকের বাথটাবে শিশুটিকে গোসল করানোর সময় তার মাকে সহায়তা করেছিলেন মেসি। লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিল সেই পরিবারের নাম। বহু বছর পর জানা যায়, সেই শিশুটিই ছিলেন আজকের লামিন ইয়ামাল।
ছবিটি দীর্ঘদিন জনসমক্ষে আসেনি। ইউরো ২০২৪ চলাকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ফটোসাংবাদিক জোয়ান মনফোর্ট একে আখ্যা দিয়েছিলেন "ভাগ্যের অলৌকিক ঘটনা" হিসেবে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে মেসিও সেই স্মৃতির কথা উল্লেখ করে বলেন, শিশুকালে যার সঙ্গে ছবি তুলেছিলেন, আজ তার বিপক্ষেই বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলছেন—এটি জীবনের অন্যতম অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা।
মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামালের অর্জনের তালিকা ঈর্ষণীয়। বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমি থেকে উঠে এসে মূল দলে জায়গা করে নেওয়া, ইউরো ২০২৪ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং এরপর বিশ্বকাপ জয়—সবকিছুই যেন রূপকথার গল্প।
বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল না করলেও স্পেনের আক্রমণভাগে সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন ইয়ামাল। তাঁর গতি, ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা এবং একের পর এক আক্রমণ আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে রাখে। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে স্পেন শিরোপা নিশ্চিত করলে বিশ্বচ্যাম্পিয়নের পদক গলায় ওঠে ইয়ামালেরও।
স্পেনের কাতালোনিয়ার শ্রমজীবী এলাকা রোকাফোন্দা থেকে উঠে আসা এই তরুণ নিজের শিকড় কখনো ভোলেননি। গোল উদযাপনের সময় প্রায়ই হাতের ইশারায় নিজের এলাকার পোস্টকোড "৩০৪" তুলে ধরেন তিনি।
ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যামও এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মেসির সঙ্গে কারও তুলনা করা কঠিন, তবে ইয়ামালের খেলায় তিনি সেই বিরল প্রতিভার অনেক বৈশিষ্ট্য দেখতে পান। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মানবিক অবস্থানের কারণেও আলোচনায় এসেছেন ইয়ামাল।
বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা শিরোপা জয়ের পর বিজয় শোভাযাত্রায় তিনি হাতে তুলে নেন একটি বড় ফিলিস্তিনি পতাকা। মুহূর্তটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে নানা প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।
পরে গাজার আল-শাতি শরণার্থী শিবিরে স্থানীয় শিল্পীরা ধ্বংসস্তূপের দেয়ালে ইয়ামালের একটি বড় ম্যুরাল আঁকেন। অনেক ফিলিস্তিনি তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতির একজন ফুটবলারের এই সংহতি তাদের জন্য কঠিন সময়েও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।
মরক্কো থেকে আসা মুসলিম বাবা এবং ইকুয়েটোরিয়াল গিনির মায়ের সন্তান লামিন ইয়ামাল কখনো নিজের পরিচয় আড়াল করেননি। স্পেনের একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে গ্যালারি থেকে ইসলামবিদ্বেষী স্লোগান ওঠার পর তিনি প্রকাশ্যে এর প্রতিবাদ জানান। তাঁর ভাষায়, এমন মন্তব্য শুধু একজন খেলোয়াড়কে নয়, একটি পুরো সম্প্রদায়কেই অসম্মান করে।
বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ইয়ামাল বিশ্বাস করেন, ফুটবল মানুষের মধ্যে বিভাজন নয়, ঐক্য সৃষ্টি করে। তাঁর জীবনও যেন সেই বাস্তবতার প্রতিফলন—মরক্কান বাবা, ইকুয়েটোরিয়াল গিনিয়ান মা এবং স্পেনের জার্সিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের এক অনন্য কাহিনি। আর সেই কিংবদন্তির বিদায়ের প্রাক্কালেই বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনের ঘোষণা দিলেন লামিন ইয়ামাল।
তিনি এখনও মেসি নন, হয়তো কখনো হবেনও না। কারণ প্রতিটি কিংবদন্তির পথ আলাদা। তবে এত অল্প বয়সে ইউরোপ এবং বিশ্ব—দুই মঞ্চেই সফলতা, অসাধারণ ফুটবল নৈপুণ্য এবং মাঠের বাইরেও স্পষ্ট মানবিক অবস্থান তাঁকে ইতোমধ্যেই নতুন প্রজন্মের অন্যতম প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মেসির কোলের সেই পাঁচ মাসের শিশুটি আজ বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে। ভবিষ্যৎ বলে দেবে তিনি কতটা উচ্চতায় পৌঁছাবেন। তবে একটি বিষয় এখনই স্পষ্ট—ফুটবলের নতুন যুগের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজনের নাম লামিন ইয়ামাল।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
ফুটবল থেকে আরও পড়ুন
বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরে স্পেনের দুই ফুটবলারের ওপর কেন চড়াও হলেন পারেদেস?
বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর মাঠেই অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিলেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারদেস। ম্যাচ শেষে স্পেনের দুই ফুটবলার এরিক গার্সিয়া ও গাভির সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে তাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

ফেরান তোরেসের গোলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন, আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপ জয়
স্পেনের আধিপত্যের সামনে শেষ পর্যন্ত টিকতে পারল না বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। নিউইয়র্ক স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছে লা রোজা।

মার্টিনেজের রেকর্ড ১০ সেভ, এনজোর লাল কার্ড, অতিরিক্ত সময়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে একাই যেন আর্জেন্টিনাকে টিকিয়ে রাখলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। স্পেনের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনালে রেকর্ড ১০টি সেভ করেন তিনি। তবে ইনজুরি সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখায় ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো দলই গোলের দেখা না পাওয়ায় শিরোপা নির্ধারণ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।

বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের দাপট, চাপে থেকে গোলশূন্য প্রথমার্ধ শেষ করল আর্জেন্টিনা
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালের প্রথমার্ধে মাঠজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করেছে স্পেন। বলের দখল, আক্রমণ গঠন, লক্ষ্যে শট এবং পাসিং, প্রতিটি বিভাগেই এগিয়ে ছিল লা রোজা। গোলের দেখা না পেলেও বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে চাপে রেখে গোলশূন্য অবস্থায় বিরতিতে যায় দুই দল।









