ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি স্কুলের বাংলা ভাষার পাঠ্যবই থেকে ‘পানি’, ‘আব্বা’ ও ‘আম্মা’ শব্দ বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব শব্দের পরিবর্তে ব্যবহার করা হবে ‘জল’, ‘বাবা’ ও ‘মা’।
২০২৭ সাল থেকে নতুন পাঠ্যবইয়ে এ পরিবর্তন কার্যকর করার পরিকল্পনা নিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার চলতি বছরের জুলাইয়ে গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে স্কুলের পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে।
নতুন পরিকল্পনায় হিন্দুত্ববাদী নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার পাশাপাশি মুঘল শাসনামল ও মার্কসবাদবিষয়ক বেশ কিছু বিষয় বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটির প্রধান এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বাংলা ভাষার পাঠ্যবই থেকে ‘পানি’, ‘আব্বা’ ও ‘আম্মা’ শব্দগুলো বাদ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, বাংলায় কথা বলার সময় সাধারণত এসব শব্দ ব্যবহার করা হয় না। এর পরিবর্তে দৈনন্দিন কথাবার্তায় ব্যবহৃত ‘জল’, ‘বাবা’ ও ‘মা’ শব্দগুলো রাখা হবে।
২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন পাঠ্যবইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে এবার পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও জানান, আগামী ২ জানুয়ারির মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দিতে হবে। ১২ কোটির বেশি বই প্রকাশের কাজ থাকায় এবার প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সীমিত পরিসরে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন পাঠ্যবইয়ে উত্তরপ্রদেশের সিনৌলি ও হরিয়ানার রাখিগড়িতে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য যুক্ত করা হবে। এসব নিদর্শন আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনসংক্রান্ত প্রচলিত তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, আগে শেখানো হতো, আর্যরা ভারতে সভ্যতা নিয়ে এসেছিল এবং রথ ও ঘোড়ার প্রচলন করেছিল। তবে সিনৌলি ও রাখিগড়িতে সাম্প্রতিক খননকাজে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এই তত্ত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ইতিহাসের বইয়ে এসব নতুন তথ্য যুক্ত করা হবে।
কমিটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ইতিহাসের বই থেকে মুঘল ইতিহাসের বেশ কিছু অংশ, ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনবিষয়ক কয়েকটি অধ্যায় এবং মার্কসবাদ নিয়ে আলোচনা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিবাজী উৎসব’ এবং দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’-এর মতো কবিতা ও নাটক পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয়েছে। তবে সিরাজউদ্দৌলাকে নিয়ে লেখা একটি নাটক এবং রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন নিয়ে ইতিহাসের বইয়ে একটি অধ্যায় যুক্ত করেছিল। পাশাপাশি স্কুলছাত্রীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রকল্প ‘কন্যাশ্রী’ নিয়েও পাঠ্যবইয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল। নতুন পাঠ্যসূচিতে এসব বিষয়ও বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর আগে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, রাজ্য সরকার স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে। তবে তখনো পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের হাতে পৌঁছায়নি।
এ ছাড়া স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, অটোপাস বা কাউকে অকৃতকার্য না করার নীতি বাতিল এবং পুনরায় ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (এনসিসি) চালুর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তিনি স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে। একই সঙ্গে পাস-ফেল পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে স্কুলগুলোতে ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (এনসিসি), ন্যাশনাল সার্ভিস স্কিম (এনএসএস) ও ব্রতচারী কার্যক্রম চালুর পক্ষেও তাঁর অবস্থান রয়েছে।









