বাংলাদেশ
দুই বছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতায় ধস, অটুট চীনের ভাবমূর্তি

দুই বছর আগে বাংলাদেশিদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ২০২৬ সালে এসে সেই ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ শতাংশ পয়েন্টে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় বাংলাদেশিদের দৃষ্টিতে চীনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ব্যবধান এতটা বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের ধারণা নিয়ে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৪ ও ২০২৬ সালের দুটি তুলনামূলক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৫২ শতাংশ বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। একই সময়ে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৫৫ শতাংশ বাংলাদেশির। অর্থাৎ, দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ৩ শতাংশ পয়েন্ট।
তবে ২০২৬ সালের জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে। অর্থাৎ, দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা কমেছে ২৬ শতাংশ পয়েন্ট। অন্যদিকে, চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সামান্য বেড়ে ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে দুই দেশের গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান ৩০ শতাংশ পয়েন্টে পৌঁছেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ড, পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের পর যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশিদের চোখে চীনের ভাবমূর্তি এই সময়ে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ৫৫ শতাংশ বাংলাদেশি চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন, ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে হয়েছে ৫৬ শতাংশ।
পিউ রিসার্চ সেন্টার ২০২৬ সালের গবেষণার জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারের বেশি মানুষের ওপর জরিপ চালায়। অংশগ্রহণকারীদের কাছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ‘খুবই ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক নাকি খুবই নেতিবাচক’ তা জানতে চাওয়া হয়।
দুই দেশের নেতাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশিদের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তির পতন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ২০২৪ সালের জরিপে ৪৭ শতাংশ বাংলাদেশি মনে করতেন, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বিশ্বপরিস্থিতির ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ২০২৬ সালের জরিপে এই আস্থা কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে।
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ওপর বাংলাদেশিদের আস্থা ২০২৪ সালের ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৬১ শতাংশ হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পেছনে দুটি প্রধান কারণের কথা উল্লেখ করেছেন।
এর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বিদেশে জনকল্যাণমূলক কাজের সক্ষমতা কমে যাওয়া। তিনি বলেন, ইউএসএআইডির অর্থায়নে পরিচালিত অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রকল্প বিদেশে ওয়াশিংটনের প্রতি সমর্থন আদায়ের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল। অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, ‘এই সব কিছু মিলেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।’
দুই বছর আগেও বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের মানুষ চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি পছন্দ করতেন। ২০২৪ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৩৫টি দেশের জরিপে দেখা যায়, ২২টি দেশের মানুষ চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বেশি ইতিবাচক ছিলেন।
কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। জরিপ করা ৩৬টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি দেশের মানুষ এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখেন। মাত্র ছয়টি দেশ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে। পাঁচটি দেশে দুই দেশের বিষয়ে মতামত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত।
বেশির ভাগ দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব কমেছে। এর ব্যতিক্রম ইসরায়েল ও হাঙ্গেরি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার চিত্রেও এই পরিবর্তনের মাত্রা স্পষ্ট। ২০২৪ সালে প্রতি ১০ জন দক্ষিণ কোরিয়ান নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৮ জন যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। ২০২৬ সালে সেই হার কমে চারজনে দাঁড়িয়েছে।
অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে পতনের পেছনে ১৯৯০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিয়মভিত্তিক উদার বৈশ্বিক ব্যবস্থার ক্ষয়কে দায়ী করেছেন। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানকে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় না দিয়ে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের দিকে ঝোঁক, আক্রমণাত্মক অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং মার্কিন রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান বর্ণবাদ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের কারণেই আমেরিকার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও ফিলিপাইনের মানুষ এখনো চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখেন। অন্যদিকে, মাত্র ১৫ শতাংশ পাকিস্তানি যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। বিপরীতে ৯০ শতাংশ পাকিস্তানি চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। ২০২৬ সালের জরিপে এটিই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার মানুষের মধ্যেও চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি দেখা গেছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর তুলনায় উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের পতন বেশি হয়েছে।
২০২৪ সালে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ৫৭ শতাংশ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। একই সময়ে চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা ছিল ২৮ শতাংশ মানুষের। ২০২৬ সালে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ১৯ শতাংশ পয়েন্ট কমে ৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, চীনের গ্রহণযোগ্যতা ১২ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৪০ শতাংশ হয়েছে।
কানাডার উদাহরণে এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট। ২০২৪ সালে বেশির ভাগ কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন। তখন চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা ছিল মাত্র ২০ শতাংশ মানুষের। ২০২৬ সালে এসে চিত্র বদলে গেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক ধারণা ৩৩ শতাংশ কানাডিয়ানের, যেখানে চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা রয়েছে ৪৪ শতাংশের।
সিঙ্গাপুর, স্পেন, গ্রিস ও ইতালিসহ বেশ কয়েকটি উচ্চ আয়ের দেশেও মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে ২০২৪ সালে দুই দেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাবের ব্যবধান তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তবে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা কমা এবং চীনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায় ব্যবধান অনেক বেড়েছে।
জরিপ করা প্রায় ৯০ শতাংশ মধ্যম আয়ের দেশেই মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এই তালিকায় ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, তুরস্ক, মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, পেরু ও আর্জেন্টিনার মতো বিভিন্ন অঞ্চলের দেশ রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী জনমতের দিক দিয়ে চীন এগিয়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাচ্ছে বলে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, বেইজিং মূলত সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে।
তিনি বলেন, ‘চীনের এখন শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা, অবকাঠামো উন্নয়নের ভালো রেকর্ড এবং আরও কার্যকর পাবলিক ডিপ্লোমেসি রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইস্যুতে নীরব থাকলেও চীন এখন বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে, অনেক বেশি সোচ্চার হয়েছে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমলে নেওয়ার মতো কিছু নেই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিরোধীদের তোলা অভিযোগে আমলে নেওয়ার মতো কিছু নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

দুর্যোগের সময় ভুয়া তথ্য ঠেকাবে টিকটকের নতুন টুল
বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে বাংলাদেশে নতুন সার্চ গাইড চালু করেছে টিকটক। বর্ষাকালে বন্যার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য জানতে এই গাইড ব্যবহার করতে পারবেন বাংলাদেশের টিকটক ব্যবহারকারীরা। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য ও গুজব মোকাবিলাতেও গাইডটি সহায়ক হবে।

এনপলি গ্রুপের বার্ষিক পরিবেশক সম্মেলন অনুষ্ঠিত
দেশের নির্মাণ ও বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এনপলি গ্রুপের ‘বার্ষিক পরিবেশক সম্মেলন-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর ডিএসই কনভেনশন সেন্টারে দিনব্যাপী আয়োজিত এ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৪৫০-এর বেশি পরিবেশক অংশ নেন।

কুষ্টিয়ায় ডিসি পার্কের পুকুরে গোসল করতে নেমে কলেজছাত্রের মৃত্যু
কুষ্টিয়ায় বন্ধুদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে কাওসার (২৫) নামের এক কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুরে কুষ্টিয়া ডিসি পার্কের পুকুরে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর তার মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।









