এলজিইডির চার প্রকল্পে পিডি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, গোপনে চার কর্মকর্তার নাম প্রস্তাবের অভিযোগ

দূরবীন ডেস্ক


স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) চারটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী মহলের তৎপরতায় গত ১৮ জুন স্থানীয় সরকার বিভাগে অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকারের জন্য এলজিইডির বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের চার নেতার নাম গোপনে প্রস্তাব করা হয়। বিষয়টি অধিদপ্তরের অধিকাংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানতেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এমনকি পিডি নিয়োগের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো প্রস্তাবসংক্রান্ত নথিও এলজিইডিতে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আমিরুল ইসলামের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি ছাত্রলীগ, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। এ কারণে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলেও জানা গেছে।
কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটির ৪৮ নম্বর সদস্য মো. শাহজাহান আলীর নাম। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে তিনি গাজীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। বর্তমানে তিনি এলজিইডি সদর দপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কর্মরত।
অন্যদিকে, হাওর অঞ্চলের উড়াল সড়ক ও ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (প্রথম সংশোধিত) পিডি হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কমিটির ৪৯ নম্বর সদস্য ও কুয়েট ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মো. ফেরদৌস আহমেদের নাম।
শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে তিনি সিলেট জেলার সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী ছাড়াও এলজিইডি সদর দপ্তরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও এনএসআইয়ের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বলে সূত্রের দাবি। এ কারণে তাকেও নির্বাহী প্রকৌশলী পদে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এ ছাড়া পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের পিডি হিসেবে মোহাম্মদ সায়েদুজ্জামান সাদেকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তার প্রভাবের কারণে তিনি প্রায় ১২ বছর জামালপুর জেলায় সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ বিষয়ে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর পিডি নিয়োগে স্বচ্ছতা, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। গোপনীয়তার সঙ্গে প্রস্তাব পাঠানো এবং নির্দিষ্ট একটি সংগঠনের নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগে অধিদপ্তরের ভেতরে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
তাদের ভাষ্য, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে এলজিইডির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এমন সময়ে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ চার প্রকল্পের পিডি নিয়োগে এ ধরনের হস্তক্ষেপকে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা।
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষয়ের নেতৃবৃন্দের কাছে এলজিইডি কতটা নিরাপদ থাকবে, তা নিয়েও কর্মকর্তাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পিডি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও পেশাগত যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরির পাশাপাশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট চার কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।






