সকালের আলো তখন একটু একটু করে তীব্র হচ্ছে। শহরের দোকানের ঝাঁপ উঠছে, স্কুলের পোশাক পরে ছুটছে শিশুরা, অফিসগামী মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। ভোলার সদর রোড, নতুন বাজার, বাংলা স্কুল মোড় কিংবা ব্যস্ত কোনো মোড়ে দাঁড়ালে অন্যরকম এক দৃশ্য চোখে পড়ে। একটার পর একটা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ছুটে আসছে। কোনোটি হঠাৎ থেমে যাচ্ছে রাস্তার মাঝখানে, কোনোটি যাত্রী নামাতে গিয়ে আটকে দিচ্ছে পেছনের গাড়ির পথ। আবার কোথাও কয়েকটি অটোরিকশা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যাত্রী ডাকছে। কোন অটা রিক্সা নিজ খেয়োলে গাড়ি ঘুড়াতে শুরু করেছে। সামনে এগোতে না পেরে মোটরসাইকেল, রিকশা, পণ্যবাহী ভ্যান কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির চালকেরা অপেক্ষা করছেন। হর্নের শব্দে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ।
কয়েক মিনিটের এই দৃশ্য কখনো কখনো দীর্ঘ যানজটে পরিণত হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে মানুষের ভিড়, মাঝখানে অটোরিকশার সারি, তার ফাঁকে মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের ছুটে চলার চেষ্টা—সব মিলিয়ে শহরের ব্যস্ত সড়ক যেন ক্রমেই আরও সংকুচিত হয়ে আসছে।
অথচ এই অটোরিকশাই ভোলার বহু মানুষের কাছে স্বস্তির বাহন। অল্প ভাড়ায় বাড়ি থেকে বাজার, বাজার থেকে হাসপাতাল, স্কুল থেকে বাসা কিংবা কর্মস্থলে পৌঁছে দেয়। গণপরিবহনের সীমিত সুযোগের মধ্যে স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের কাছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা অনেকটাই নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেই নির্ভরতার বাহন যখন সংখ্যায় বাড়তে বাড়তে শহরের সড়ক দখল করে নেয়, তখন স্বস্তির জায়গাতেই জন্ম নেয় নতুন অস্বস্তি।
ভোলা শহরে এখন ঠিক কতটি অটোরিকশা ও ইজিবাইক চলছে, সেই প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর নেই কোনো একক দপ্তরের কাছে। কতটি পৌরসভার লাইসেন্সপ্রাপ্ত, কতটি নতুন করে সড়কে নেমেছে, কতটি অনুমোদনহীন—এসবের সমন্বিত হালনাগাদ হিসাবও নেই। ফলে শহরের সড়কে প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা দেখা যাচ্ছে, তার কতটা নিয়মের মধ্যে আর কতটা নিয়মের বাইরে, সেটিই যেন অজানা থেকে যাচ্ছে।
এই অজানার মধ্যেই বাড়ছে যানজট। বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। বাড়ছে চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্ন। আর বাড়ছে শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনায় চাপ।
ভোলা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের দিকে প্রায় ১ হাজার ২০০ অটোরিকশাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে নতুন করে অটোরিকশার লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না।
তাঁর ভাষ্য, এরপরও যেসব অটোরিকশা নতুন করে সড়কে নামছে, সেগুলো অনুমোদনহীনভাবে চলাচল করছে। তবে লাইসেন্সবিহীন অটোরিকশার প্রকৃত সংখ্যা পৌরসভার কাছে নেই।
এই বক্তব্যের মধ্যেই সমস্যাটির একটি বড় দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ জানে নতুন করে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে না, আবার নতুন যান সড়কে নামার কথাও বলছে; কিন্তু সড়কে ঠিক কতটি এমন যান চলছে, সেই সংখ্যাটি জানা নেই। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের আগে যে মৌলিক তথ্যটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেই সংখ্যাটিই এখনো অন্ধকারে।
শহরের সড়কে নতুন অটোরিকশা আসার পেছনে কোথায় কতটা ভূমিকা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। পৌরসভার এই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অবৈধ অটোরিকশা তৈরির কারখানার বিরুদ্ধে শিগগির অভিযান পরিচালনা করা হবে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ভোলা পৌরসভার লাইসেন্স শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইসেন্স ইন্সপেক্টর মো. রাকিব জানান, শহরে ইজিবাইকের শোরুম ও কারখানা মিলিয়ে ১৭টি প্রতিষ্ঠানের পৌর ব্যবসায়িক লাইসেন্স রয়েছে। এর বাইরে আরও প্রতিষ্ঠান থাকলেও অনেকের লাইসেন্স নেই বলে জানান তিনি।
তবে এখানেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। কোনো শোরুম বা কারখানার পৌর ব্যবসায়িক লাইসেন্স থাকা মানেই সেখান থেকে বিক্রি হওয়া প্রতিটি অটোরিকশার সড়কে চলাচলের অনুমোদন থাকা নয়। একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি এবং একটি নির্দিষ্ট যানবাহনের সড়কে চলাচলের বৈধতা—দুটি আলাদা বিষয়। ফলে শুধু ব্যবসায়িক লাইসেন্সের সংখ্যা দিয়ে শহরে বৈধ অটোরিকশার সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
শহরের বাস্তব চিত্র আরও একটি প্রশ্ন সামনে আনে—অটোরিকশাগুলো কোথায় দাঁড়াবে?
পৌরসভার নির্ধারিত পার্কিংয়ের জায়গা থাকলেও দ্রুত যাত্রী পাওয়ার আশায় অনেক চালক সড়কের বিভিন্ন মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাঁড়িয়ে থাকেন বলে জানিয়েছেন পৌরসভার কর্মকর্তা। যাত্রী ওঠানোর জন্য কয়েক মিনিটের অপেক্ষা কখনো কখনো পুরো সড়কের স্বাভাবিক গতিকে থামিয়ে দেয়।
সকালের ব্যস্ত সময়ে এই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ, বাজারের ক্রেতা, রোগী বহনকারী স্বজন এবং পণ্য নিয়ে ছুটে চলা ব্যবসায়ীদের চাপ। বিকেলে অফিস ছুটির পর একই সড়কে ফিরে আসে আরও বড় ভিড়। তখন একটি অটোরিকশার হঠাৎ থেমে যাওয়া শুধু একটি গাড়ির পথ আটকে রাখে না; তার পেছনে তৈরি হয় আরও কয়েকটি গাড়ির অপেক্ষা।
এভাবেই ছোট ছোট অনিয়ম মিলিয়ে বড় হয়ে ওঠে যানজট।
ভোলা ট্রাফিক পুলিশের টিআই আজিজুল করিম জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাসে যত্রতত্র পার্কিংয়ের কারণে প্রায় ৯০টি অটোরিকশাকে জরিমানা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আনুমানিক ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইজিবাইক ও অটোরিকশার কারণে সৃষ্ট যানজটের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা সভায়ও আলোচনা হয়েছে। যানজট নিয়ন্ত্রণে ভোলা পৌরসভাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা সমন্বয় করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
টিআই আজিজুল করিমের মতে, যেভাবে অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে শহরে যানজটও বাড়ছে। যত্রতত্র পার্কিং বন্ধ করে পৌরসভার নির্ধারিত এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল সীমাবদ্ধ রাখা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তবে যানজটের গল্পের সঙ্গে আরেকটি উদ্বেগ ধীরে ধীরে সামনে আসছে—দুর্ঘটনা।
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে ভোলায় অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংঘর্ষে অন্তত সাতজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার সবগুলো অটোরিকশার কারণে ঘটেছে—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে আলাদা কারণ থাকতে পারে। তারপরও সড়কে যত্রতত্র থামানো, হঠাৎ ঘুরে যাওয়া, বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল কিংবা বিভিন্ন যানবাহনের মধ্যে দূরত্ব কমে আসা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু চালকের অদক্ষতা, অতিরিক্ত গতি, সড়কের মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানামা এবং কখনো উল্টো পথে চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
কিন্তু এই অভিযোগগুলোরও একটি গভীর দিক আছে। অটোরিকশার স্টিয়ারিংয়ে বসা মানুষটি কে? তাঁর চালানোর প্রশিক্ষণ আছে কি না? তাঁর কোনো বৈধ অনুমোদন আছে কি না? যানটির ব্রেক, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা উপকরণ ঠিকঠাক আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর না জেনে শুধু সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা গুনে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
কারণ একটি দুর্ঘটনার মুহূর্তে সামনে শুধু একটি অটোরিকশা থাকে না; থাকে একজন চালকের সিদ্ধান্ত, একজন যাত্রীর জীবন, একজন পথচারীর নিরাপত্তা এবং একটি পরিবারের অপেক্ষা।
অটোরিকশার বাড়তে থাকা সংখ্যা শুধু সড়কেই চাপ তৈরি করছে না। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও।
ভোলা বিদ্যুৎ সরবরাহ, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ জানান, ইজিবাইক চার্জ দেওয়ার জন্য শহরে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত প্রায় ২৫টি মিটার বা সংযোগ রয়েছে। প্রতিটি সংযোগে প্রায় ১০ কিলোওয়াট করে লোড রয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগে অটোরিকশা চার্জের জন্য প্রায় ২০০ কিলোওয়াটের মতো লোড প্রয়োজন হতো। বর্তমানে শহরে অটোরিকশা চার্জে প্রায় ৫০০ কিলোওয়াট লোড নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ইজিবাইক চার্জে ব্যবহৃত হচ্ছে।
অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাই চার্জিং গ্যারেজের সংখ্যাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে সামনে আসছে বিদ্যুৎ সংযোগের বৈধতার প্রশ্ন। কোথাও অনুমোদিত সংযোগের বাইরে বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে কি না, চার্জিং গ্যারেজগুলো নিরাপদ কি না, বৈদ্যুতিক সংযোগে ত্রুটি রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও এখন নজরদারির দাবি রাখে।
কারণ একটি ব্যাটারি চার্জ হওয়ার পেছনে শুধু বিদ্যুৎ খরচ হয় না; সেখানে নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরের ভেতরে একাধিক ব্যাটারি একসঙ্গে চার্জ দেওয়া হলে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ জানিয়েছেন, ভোলায় অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তবে পুরো সমস্যাটিকে শুধু অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে দেখলে চিত্রটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভোলার শহুরে জীবনে এসব যানবাহনের প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গণপরিবহনের সীমিত সুযোগের মধ্যে অটোরিকশাই অনেক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের সহজ সমাধান। একজন দিনমজুরের কাছে এটি কর্মস্থলে যাওয়ার বাহন, একজন শিক্ষার্থীর কাছে স্কুল-কলেজে পৌঁছানোর উপায়, একজন রোগীর কাছে হাসপাতালে যাওয়ার দ্রুত মাধ্যম। আবার বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভর করছে এই যান চালানোর ওপর।
তাই প্রশ্নটি অটোরিকশা থাকবে কি থাকবে না—এমন সরল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, কতটি থাকবে, কোথায় চলবে, কী নিয়মে চলবে এবং কে তা নিয়ন্ত্রণ করবে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন একটি সমন্বিত জরিপ। ভোলা শহর ও জেলার সড়কে চলাচলকারী সব অটোরিকশা ও ইজিবাইকের প্রকৃত সংখ্যা বের করতে হবে। আলাদা করতে হবে পৌরসভার লাইসেন্সধারী, অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন যানবাহন। দেখতে হবে কোন যানটি কবে সড়কে নেমেছে, কোথা থেকে এসেছে এবং তার কাগজপত্র কী।
এরপর প্রয়োজন চালকদের বিষয়ে একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা। কে প্রশিক্ষিত, কে প্রশিক্ষণহীন, কার প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে এবং কার নেই—এসব তথ্যও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
শুধু গাড়ি ও চালকের তথ্য থাকলেই হবে না। শহরের কোথায় অটোরিকশা দাঁড়াবে, কোথায় যাত্রী ওঠানামা করবে, কোন সড়কে কতটি যান চলবে—সেটিও পরিকল্পনার অংশ হতে হবে। একটি ছোট শহরের প্রতিটি মোড়কে যদি স্ট্যান্ড বানিয়ে ফেলা হয়, তাহলে যানজট কমার বদলে আরও বাড়বে। আবার কোনো নির্ধারিত স্ট্যান্ড যদি যাত্রী ওঠানামার বাস্তব চাহিদা থেকে অনেক দূরে থাকে, চালকেরা স্বাভাবিকভাবেই মূল সড়কে ফিরে আসবেন।
ভোলার ক্ষেত্রে এই বাস্তবতাটিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। কারণ ২০২৫ সালে নতুন বাজার এলাকায় অটোরিকশা ও সিএনজির জন্য নির্ধারিত স্ট্যান্ড এবং সড়কে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগে ওই এলাকার যানজট অনেকটাই কমেছিল বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
অর্থাৎ শুধু অভিযান নয়, সঠিক ব্যবস্থাপনাও যে কাজ করতে পারে, তার স্থানীয় নজির রয়েছে।
ভোলা পৌরসভা, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ তাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কোন সংস্থা কোন ধরনের অনুমোদন দেয়, কোন কর্তৃপক্ষ কোন যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোথায় দায়িত্বের সীমা শেষ হয়—সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
দেশের অন্যান্য জেলা শহরের অভিজ্ঞতাও দেখায়, ইজিবাইকের সংখ্যা বেড়ে গেলে লাইসেন্সধারী ও অনুমোদনহীন যানবাহনের পার্থক্য স্পষ্ট না থাকলে যানজট নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও নির্ধারিত স্ট্যান্ড ও রুট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা হয়েছে, আবার কোথাও লাইসেন্সের তুলনায় কয়েক গুণ যান চলাচলের অভিযোগও উঠেছে।
ভোলার সমস্যাটিও তাই শুধু ‘অটোরিকশা বেশি’—এই এক বাক্যে শেষ করার মতো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগর পরিকল্পনা, গণপরিবহনের ঘাটতি, মানুষের যাতায়াতের প্রয়োজন, চালকদের জীবিকা, পৌর ব্যবস্থাপনা, সড়কের ধারণক্ষমতা, আইন প্রয়োগ এবং নিরাপত্তা।
সবচেয়ে বড় কথা, শহরের সড়ক মানুষের জন্য। অটোরিকশা মানুষের চলাচল সহজ করার জন্য; মানুষের পথ আটকে দেওয়ার জন্য নয়।
ভোর থেকে রাত পর্যন্ত যে অটোরিকশাগুলো ভোলার অলিগলি ও প্রধান সড়ক ঘুরে বেড়ায়, তাদের প্রতিটির পেছনে আছে একজন চালকের জীবিকা এবং প্রতিটি যাত্রীর প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রয়োজন যেন অন্য মানুষের নিরাপত্তা কেড়ে না নেয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এখন দরকার সংখ্যা গোনা, নিয়ম স্পষ্ট করা এবং দায়িত্ব নির্ধারণ করা। কতটি গাড়ি চলবে—তার চেয়েও জরুরি, কোন গাড়ি চলবে, কোথায় চলবে এবং কী শর্তে চলবে, সেই প্রশ্নের উত্তর বের করা।
কারণ আজ যে যানজট কয়েক মিনিটের বিরক্তি তৈরি করছে, সেটি যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়তে থাকে, আগামী দিনে তা শহরের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার জন্য বড় সংকট হয়ে উঠতে পারে। আর যে অটোরিকশা আজ একজন মানুষের ঘরে ফেরার সহজ পথ, সেটি যেন কাল আরেকটি পরিবারের কান্নার কারণ না হয়—নিরাপদ ও শৃঙ্খলিত সড়ক ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত সেটিই।










