ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর: স্কুল থেকে ফেরার পথে ষোলো বছরের ছেলেকে অনুসরণ করছিলেন এক তরুণ। বারবার একটি কাগজ দেখতে বলছিলেন, কিন্তু তাঁর গতিবিধি ছিল সন্দেহজনক। একপর্যায়ে ছেলেটি দৌড়ে পাশের একটি দোকানে ঢুকে সাহায্য চায়। দোকানিরা বেরিয়ে আসতে দেখেন, ওই তরুণ সটকে পড়েছেন। মাস তিনেক আগের এই ঘটনা এখনো ভোলেননি মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তামান্না ইয়াসমিন। তাঁর ছেলে মোহাম্মদ ওশান (১৬) সেন্ট জোসেফ স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। তিনি জানান, এর আগেই ছেলের দুই বন্ধু ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল—একজনের মুঠোফোন, আরেকজনের সাইকেল ছিনিয়ে নিয়েছিল তাদেরই সমবয়সীরা। "খুব আতঙ্ক লাগে। কত আর চোখে চোখে রাখা যায়!" — বলেন তামান্না। সারা দেশে কিশোর গ্যাং বা অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্যে এখন সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত অসংখ্য মা-বাবা। একদিকে সন্তানের নিরাপত্তা, অন্যদিকে সন্তান নিজেই বিপথে যায় কি না—এই দুই দুশ্চিন্তা তাঁদের তাড়া করছে। সেই লড়াইয়ের গল্প জানালেন মোহাম্মদপুরের তামান্না ইয়াসমিন ও উত্তরার লাকি রহমান। অপ্রতিম হত্যায় বেড়েছে আতঙ্ক গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যার শিকার হয়। পুলিশের ভাষ্য, তার আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে হত্যা করা হয়; জড়িতরা ছিল তার পূর্বপরিচিত। এ মামলায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ দুই কিশোর 'আরজেড-৩৬' নামের গ্যাংয়ের সদস্য বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এই ঘটনার পর অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মোহাম্মদপুরের চিত্র মোহাম্মদপুরের অপরাধচক্র নিয়ে আলোচনা পুরোনো। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশি তৎপরতা দুর্বল হয়ে পড়লে এলাকাটিতে অপরাধ বেড়ে যায় বলে অভিযোগ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুরে অর্ধশতাধিক অপরাধী দল সক্রিয়, যার মধ্যে কিশোর গ্যাংও রয়েছে। ওশানের মা-বাবার মতে, পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তাই সন্তানকে নিরাপদ রাখতে ও বিপথগামিতা ঠেকাতে তাঁদের বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে।

সন্তানকে যেভাবে আগলে রেখেছেন তামান্না

তামান্না জানান, ছেলেকে তিনি শিখিয়েছেন—কোন বিষয়গুলো তার জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যাতে সে সবকিছু তাঁকে খুলে বলে। ছেলের মুঠোফোনসহ বিভিন্ন ডিভাইসের পাসওয়ার্ড তাঁর জানা। তাঁর মতে, আধুনিক যুগে সন্তানের জন্য ডিভাইসও জরুরি। ছেলে যেন 'খারাপ সঙ্গ' থেকে দূরে থাকে, সেজন্য তাকে স্কুলের আইটি ক্লাব ও সায়েন্স ক্লাবে যুক্ত করেছেন। এ বছর সায়েন্স ক্লাবের 'নিউক্লিয়াস' সাময়িকী প্রকাশের দায়িত্বে ছিল ওশান। গত বছর বইমেলায় ওশানের ইংরেজি কবিতার বই 'পেটালস বিনিথ অ্যাশেস' প্রকাশিত হয়। "বাইরের নিরাপত্তা যদি ঠিকঠাক থাকত, তাহলে আমাদের এত পেরেশানি হতো না। একটি কিশোরেরও তো স্বাধীনতা রয়েছে—তাকে স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হতে দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে," বলেন তামান্না। তাঁর মতে, নিরাপত্তাহীনতাই শিশুদের ঘরবন্দী জীবনের বড় কারণ, যা শিশুর জন্য জুলুম। বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। শিশু অধিকার সংগঠন 'শিশুরাই সব'-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, কিশোর বয়সে অতিরিক্ত নজরদারিকে তারা খবরদারি মনে করতে পারে। তাই প্রতিটি ক্ষেত্রে নজরদারি না করে কিশোর যা করতে চায়, সেটাকে মর্যাদার সঙ্গে দেখতে হবে। সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়তে হবে, যাতে তারা সবকিছু মা-বাবাকে খুলে বলে; ডিভাইসের ইতিবাচক ব্যবহার শেখাতে হবে।

উত্তরার লাকি রহমানের কৌশল

উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা লাকি রহমান কর্মজীবী মা। তাঁর ছেলে সাফওয়ান রহমান (১৩) মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র; মেয়ে সাওদা রহমান (২১) বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। ছেলের জন্য প্রতিদিন ৫০ টাকা বরাদ্দ লাকির—৩০ টাকা ভাড়া, ২০ টাকা টিফিন। যোগাযোগের জন্য বাসায় ছেলের জন্য একটি বাটন (ফিচার) ফোন রেখেছেন। পল্লবীতে শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা ও লাশ টুকরো করার ঘটনা এবং কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার খবর দেখার পর তাঁর দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। পাঁচ মাস আগে ছেলেকে কারাতে ক্লাসে ভর্তি করেছেন—'যেকোনো পরিস্থিতিতে যেন আত্মরক্ষা করতে পারে'। সাফওয়ান স্কুলের ডিবেট ক্লাবের সদস্য, আবৃত্তি চর্চা করে, এ বছর স্কাউটে যুক্ত হয়েছে। প্রতি বছর 'অলরাউন্ডার' ও 'স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার' পুরস্কার জিতেছে সে। লাকির মতে, নানা কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে কিশোর সন্তান বিপথে যাবে না। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব দেন সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরিতে। সপ্তাহে একদিন তাঁরা একসঙ্গে সিনেমা দেখেন। একবার ছেলের এক বন্ধু তার হাতে প্রাপ্তবয়স্কদের সিনেমার নাম চিরকুটে লিখে দিয়েছিল—ছেলের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক না থাকলে তিনি এ ঘটনা জানতেই পারতেন না। "সন্তানদের এমনভাবে বড় করা উচিত, যাতে তারা তাদের সব কথা মা-বাবাকে এসে বলতে পারে," বলেন লাকি। তিনি আরও বলেন, "আমরা বাচ্চাদের জন্য যতটুকু পারি করছি। সরকার ও সমাজের দায়িত্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা এই দায়িত্ব পালন না করলে আমরা সন্তানদের পেছনে যে খাটুনি দিচ্ছি, তার সবই বৃথা হয়ে যাবে।" উল্লেখ্য, লাকি যেখানে থাকেন, তার কাছেই উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে ৯ বছর আগে সমবয়সীদের হাতে খুন হয় কিশোর আদনান কবির (১৪)। ওই ঘটনার পরই কিশোর গ্যাং ইস্যুটি আলোচনায় আসে। 'ডিসকো বয়েজ' ও 'নাইন স্টার গ্রুপ'-এর আটজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ, তবে জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীদের হুমকির মুখে আদনানের পরিবার উত্তরা ছাড়তে বাধ্য হয়। এখনো উত্তরায় অপরাধী দলের দৌরাত্ম্য রয়েছে বলে অভিযোগ। সারা দেশের চিত্র কিশোর গ্যাং সমস্যা শুধু ঢাকার নয়—সারা দেশের। ২০২৪ সালের এপ্রিলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে প্রায় ২৩৭টি কিশোর গ্যাং রয়েছে। কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যার পর পুলিশের অভিযান জোরদার করা হয়েছে; কিশোর গ্যাংসহ অপরাধী দলের সদস্যদের ধরা হচ্ছে।

citytouch 728-X-90

সব মা-বাবার অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা নেই

শিশু বিকাশ ও অভিভাবকত্ব বিশেষজ্ঞ আঞ্জুমান পারভীন বলেন, অর্থ ব্যয় করে স্কুলের ক্লাব বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সন্তানকে যুক্ত করতে পারেন না সব মা-বাবা। স্কুলগুলোর উচিত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশে কাজ করা; সরকারের উচিত এলাকাভিত্তিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা, যেখানে সব শিশুর অংশগ্রহণ ও নিরাপত্তা থাকবে। লায়লা খন্দকার আরও বলেন, শিশু-কিশোরদের বিকাশে মাঠ ও পার্ক রাখা এবং সেখানে নিরাপত্তার সঙ্গে শিশুরা যাতে খেলতে-ঘুরতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।