যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদারের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিচ্ছে তেহরান। বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্ভাব্য হামলার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে—এমন বার্তা দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করছে ইরান।

গত এক মাসে দেশটির সামরিক কমান্ডাররা একের পর এক প্রকাশ্য বক্তব্যে দাবি করেছেন, ইরান বিপুল পরিমাণ নতুন অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা শুরু করলে এসব অস্ত্র দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানা হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে হামলার পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সমুদ্রের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট কেবল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ডেটা সেন্টার এবং আঞ্চলিক তেল-গ্যাস স্থাপনাও রয়েছে।

গত মাসের শেষ দিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ‘বিশ্ব অবাক হয়ে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এমন নতুন লক্ষ্যবস্তু রয়েছে, যেগুলোতে এখনো হামলা চালানো হয়নি।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার প্রায় নয় মাস পর সংঘাত অনেকটা অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতেও অস্থিরতা বাড়ছে।

দুই পক্ষই নিজেদের বিজয়ী দাবি করছে। তেহরানের বক্তব্য, ব্যাপক হামলার পরও তারা টিকে আছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যেই ইরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে তেহরান এখনো এসব চাপ মোকাবিলা করে যাচ্ছে।

মোহেব্বি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছে।’

যুদ্ধের আতঙ্কে সাধারণ ইরানিরা

সামরিক কমান্ডাররা শক্তি ও প্রস্তুতির কথা তুলে ধরলেও ইরানের সাধারণ মানুষ নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত মানুষ আবারও হামলার মুখে পড়ার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।

গত সপ্তাহে তেহরানের ৭০ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি প্রতিদিন প্রস্তুত থাকছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন, প্রতি রাতে আমরা অপেক্ষা করছি, কখন আবার বোমা হামলা শুরু হবে। আমি আমার সব পাওয়ার ব্যাংক চার্জ দিয়ে রেখেছি, পানির মজুত করেছি এবং প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রস্তুত রেখেছি। কারণ যেকোনো দিন, যেকোনো মুহূর্তে আবার হামলা শুরু হতে পারে।’

দুই সন্তানের এক মা জানান, প্রতিদিন সকালে সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সময় তিনি আতঙ্কে থাকেন। তাদের যাতায়াতের পথে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের দেখা যায়। সামরিক ঘাঁটিগুলোও সক্রিয় রয়েছে বলে জানান তিনি।

ওই নারী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ঠিক আর কী কী বোমা ফেলতে চায়, তা আমি জানতে চাই। তারা ইরানের নেতৃত্বকেও সরাতে পারেনি। আলোচনার মাধ্যমেও কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। তাহলে আবার যুদ্ধ শুরু করার অর্থ কী?’

তেহরানের আরেক বাসিন্দার ভাষ্য, ইরানিরা এখন যুদ্ধ আবার শুরু হবে বলে প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সবাই এখন এ নিয়েই কথা বলছে। বিষয়টি সব সময় মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, আজ রাতেই কি হামলা হবে, নাকি আগামীকাল? চারপাশে এত আলোচনা হচ্ছে যে একটু স্বস্তি নেওয়ারও সুযোগ নেই। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে উঠছে।’

যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগের কথা নির্ভয়ে বলতে সাক্ষাৎকার দেওয়া এসব ইরানি নাগরিক নিরাপত্তার কারণে নিজেদের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

ইউরোপকেও লক্ষ্যবস্তু করার ইঙ্গিত

গত কয়েক সপ্তাহে ইরানকে নিয়ে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নির্ধারণে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা একাধিক বৈঠক করেছেন। ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না। তবে কয়েকজন উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে জানিয়েছেন, এ বক্তব্য চূড়ান্ত কি না কিংবা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের আগে তা পরিবর্তিত হতে পারে কি না, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নন।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে আবার সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার জন্য নতুন পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

এসব পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’ নামে পরিচিত বিশাল ক্ষমতাসম্পন্ন বোমা ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে। জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট (এমওএবি) নামের এই অস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা। এটি ব্যবহার করা হলে সংঘাতের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

তবে ইরানের সেনাবাহিনীর কমান্ডার আলিরেজা শেখ শনিবার বলেন, ‘এসব প্রচারণার উদ্দেশ্য ইরানের জনগণকে ভয় দেখানো। ইরানের জনগণই সব বোমার মা।’

এদিকে, ইরান তার সামরিক কৌশলে আরও আক্রমণাত্মক অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, দেশটি শুধু পাল্টা হামলার প্রস্তুতিই নিচ্ছে না, বরং প্রয়োজনে আগাম হামলার পথও বিবেচনা করতে পারে।

গত সপ্তাহে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোতে জানানো হয়, ইরানজুড়ে সামরিক মহড়া চালানো হয়েছে। এতে একসঙ্গে ৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষণায় কাজ করা ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, তেহরান যদি নতুন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউরোপে হামলার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেখানে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।

এসব স্থাপনার মধ্যে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনী এবং জার্মানির রামস্টাইন সামরিক সরবরাহকেন্দ্র উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা।

তবে নাদিমির মতে, সংঘাতের মাত্রা অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরান সম্ভবত ইউরোপে হামলার এই সম্ভাবনা কাজে লাগাবে না।

মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি মাসের শুরুতে অজ্ঞাত একটি নতুন হুমকির পর যুক্তরাজ্যে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের সব দূরপাল্লার বোমারু বিমান নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাজ্যের যে বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বোমারু বিমানগুলো অবস্থান করছিল, সেখানে হামলার পরিকল্পনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনাও তুলে ধরেছেন নাদিমি।

তার মতে, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সম্ভাবনা বাড়াতে ইরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ড্রোনের আরও উন্নত ও সমন্বিত বহর তৈরি করতে পারে। এসব ড্রোনে ক্যামেরা ও তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে পারে। ফলে ড্রোনগুলো পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করা, উড্ডয়নের পথ ও গতি পরিবর্তন করা এবং শত্রুপক্ষের সংকেত বিঘ্নিত করার প্রযুক্তি ও আকাশ প্রতিরক্ষা এড়িয়ে চলার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

নাদিমি বলেন, ‘তারা এখনো এসব সক্ষমতার প্রমাণ দেয়নি। তবে অতীতে এ ধরনের প্রযুক্তি তৈরির বিষয়ে আলোচনা করেছে।’

এ ছাড়া ইরান তার