বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে কুখ্যাত গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোইয়ের নাম। ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তবে এখনো এ ঘটনায় গ্যাংটির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হয়নি।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ফুটবল খেলা শেষে গাড়িতে ফেরার সময় টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি। অভিনেতা সরাসরি গুলিবিদ্ধ না হলেও বারুদ ও কাচের টুকরায় তাঁর হাতে আঘাত লাগে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তাঁর গাড়িচালক ও এক অটোরিকশাচালক গুলিবিদ্ধ হন।
হামলার পর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও বার্তায় লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের হয়ে দায় স্বীকারের দাবি করা হয়। এতে সালমান খানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলা হয় টাইগারের বিরুদ্ধে। তবে অডিওটির সত্যতা ও হামলায় গ্যাংটির সম্পৃক্ততা এখনো যাচাই করছে পুলিশ।
এই ঘটনার সূত্র ধরে সামনে এসেছে সালমান খানের সঙ্গে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বিরোধ, ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলা এবং ২০২৪ সালে রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ। এসব ঘটনা ঘিরে বলিউড তারকাদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কে এই লরেন্স বিষ্ণোই?
লরেন্স বিষ্ণোই ভারতের পাঞ্জাবের বাসিন্দা। হত্যা, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধসংক্রান্ত একাধিক আলোচিত মামলার তদন্তে তাঁর নাম এসেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চণ্ডীগড়ে শিক্ষাজীবনে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় থেকেই অপরাধজগতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ গড়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়ে তাঁর সহযোগীদের নেটওয়ার্ক পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান, দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি। ২০২২ সালে পাঞ্জাবি সংগীতশিল্পী সিধু মুসেওয়ালা হত্যাকাণ্ডেও বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে।
বিষ্ণোই দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকলেও তাঁর সহযোগীরা বাইরে থেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে পুলিশের অভিযোগ। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশে থাকা যোগাযোগের মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক পরিচালিত হওয়ার আশঙ্কাও তদন্তকারীরা প্রকাশ করেছেন।
সালমান খানের সঙ্গে বিষ্ণোইয়ের বিরোধ কেন?
এই বিরোধের সূত্র ১৯৯৮ সালের কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলা। ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে রাজস্থানে দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে সালমান খানের বিরুদ্ধে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে কৃষ্ণসার হরিণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
২০১৮ সালে যোধপুরের একটি আদালত এ মামলায় সালমান খানকে দোষী সাব্যস্ত করে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন। পরে তিনি জামিন পান। মামলাটি ঘিরে আইনি প্রক্রিয়া চলেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লরেন্স বিষ্ণোই একাধিকবার এই মামলার প্রসঙ্গ তুলে সালমান খানকে হুমকি দিয়েছেন। অভিনেতার কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানিয়েছেন তিনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালে সালমানের বাড়ির সামনে গুলিবর্ষণ
২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমান খানের গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি গুলি চালান। এ ঘটনায় অভিনেতার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে এবং পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
তদন্তকারীরা হামলার সঙ্গে বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কথিত সদস্যদের যোগসূত্র খতিয়ে দেখেন। লরেন্সের ভাই আনমোল বিষ্ণোইয়ের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও তদন্তে আসে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর সালমান খানের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। অভিনেতার ঘনিষ্ঠজনেরাও সম্ভাব্য হুমকির ঝুঁকিতে রয়েছেন কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে।
কে ছিলেন বাবা সিদ্দিকি?
বাবা সিদ্দিকি ছিলেন মহারাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনীতিক ও সাবেক মন্ত্রী। রাজনীতির পাশাপাশি বলিউডের তারকাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর আয়োজিত বার্ষিক ইফতার অনুষ্ঠানে রাজনীতিক, চলচ্চিত্র তারকা ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০১৩ সালে এক ইফতার অনুষ্ঠানে সালমান খান ও শাহরুখ খানের দীর্ঘদিনের কথিত দূরত্ব ঘোচাতে তাঁর ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়। সালমানের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্বও ছিল সুপরিচিত।
২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর মুম্বাইয়ের বান্দ্রা পূর্ব এলাকায় গুলিতে নিহত হন ৬৬ বছর বয়সী বাবা সিদ্দিকি। তাঁর হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি বলিউডেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে এ ঘটনায় লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের কথিত সংশ্লিষ্টতা তদন্তের আওতায় আসে।
সালমানের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণেই কি খুন হন বাবা সিদ্দিকি?
তদন্তে সালমান খানের সঙ্গে বাবা সিদ্দিকির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দাখিল করা অভিযোগপত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমানের নিরাপত্তা জোরদার হওয়ায় তাঁকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তু করা কঠিন বলে সন্দেহভাজন গ্যাং সদস্যরা মনে করতেন। সে কারণে অভিনেতার ঘনিষ্ঠজনদের লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।
সালমানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বাবা সিদ্দিকিকে লক্ষ্য করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের একটি অংশ ছিল। মুম্বাইয়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কথিত উদ্দেশ্যসহ অন্য সম্ভাব্য কারণও খতিয়ে দেখা হয়।
সালমানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে কি নিশানায় টাইগার শ্রফ?
বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বলে দাবি করা অডিও বার্তায় এমন অভিযোগই করা হয়েছে। বার্তায় বলা হয়, সালমান খানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় না রাখতে টাইগারকে সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করেন।
তবে গুলির ঘটনার আগে টাইগার এমন কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না, তা পুলিশ নিশ্চিত করেনি। অডিও বার্তাটি সত্যিই বিষ্ণোই গ্যাংয়ের পক্ষ থেকে এসেছে, নাকি অন্য কেউ গ্যাংটির নাম ব্যবহার করে দায় স্বীকারের চেষ্টা করছে, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
বলিউডে কি ফিরছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের আতঙ্ক?
১৯৯০-এর দশকে মুম্বাইয়ের অপরাধজগতের সদস্যদের বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র তারকাদের ভয় দেখানো, প্রযোজকদের হুমকি দেওয়া এবং চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠত। টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা সেই সময়ের স্মৃতি আবার সামনে এনেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বলিউড-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে একাধিক ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। সালমান খানের বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণ ও বাবা সিদ্দিকি হত্যাকাণ্ড ছাড়াও সাইফ আলী খানের বান্দ্রার বাসায় ছুরিকাঘাত, নির্মাতা রোহিত শেঠির জুহুর বাড়ির বাইরে গুলিবর্ষণ এবং কানাডায় কমেডিয়ান কপিল শর্মার ক্যাফেতে হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব ঘটনার পরিস্থিতি এক নয়। এগুলোকে একই অপরাধী চক্রের পরিকল্পনার অংশ বলে ধরে নেওয়ার মতো প্রমাণ নেই।
চলচ্চিত্রকর্মীদের বিভিন্ন সংগঠন তারকাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, মুম্বাইয়ের মতো শহরে একজন তারকা নিরাপদ না থাকলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। টাইগার শ্রফ ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা জোরদারের দাবিও জানানো হয়েছে।
এখন কী হবে, অন্য তারকারাও কি ঝুঁকিতে?
টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনায় মুম্বাই পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা, সন্দেহভাজনদের শনাক্ত এবং কথিত বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডেও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার পেছনে কারা জড়িত, এর উদ্দেশ্য কী এবং বলিউড তারকাদের সঙ্গে কথিত বিরোধের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।









