নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় রাজস্ব আদায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংস্থাটির নজরদারি এখন আর শুধু সাধারণ করদাতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; মন্ত্রী, সংসদ সদস্য (এমপি), উচ্চপদস্থ আমলাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আয়-ব্যয়ের ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ এবং চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এনবিআরকে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রী, এমপি বা উচ্চপদস্থ আমলাদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক কোনো লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেলে তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশ রয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে লেনদেনের যৌক্তিক ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আয়কর রিটার্নে সম্পদ ও আয়ের সঠিক তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এনবিআরের তিনটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থা—সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর—যৌথভাবে এ নজরদারি চালাচ্ছে। পুরো কার্যক্রম তদারকি করছেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে রাজস্ব আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলা, ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং অর্থ পাচারের প্রমাণ মিললে গ্রেপ্তারের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের ভেতরে ও বাইরে সবার সততার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তবে এই নজরদারির উদ্দেশ্য কাউকে আগাম অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা নয়; বরং রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা।
৫০ লাখের বেশি বকেয়া থাকলে তলব
অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো করদাতার ৫০ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব বকেয়া থাকলে তাকে সরাসরি তলব করা হচ্ছে। তাগাদা দেওয়ার পরও বকেয়া পরিশোধ না করলে সিআইসি সংশ্লিষ্ট করদাতার বিগত পাঁচ করবর্ষের আয়কর রিটার্নের নথি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছে।
শুধু রাজনীতিবিদ বা আমলাদের ক্ষেত্রে নয়, শিল্পী, খেলোয়াড়, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের আয়কর নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পাশাপাশি পূর্ব নোটিশ ছাড়াই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝটিকা অভিযান চালাচ্ছে বিশেষ টাস্কফোর্স। অভিযানে ডিজিটাল ডেটা, কাগুজে রেজিস্টার, কারখানার প্রকৃত পণ্য এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যার মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট নথি জব্দ করা হচ্ছে।
বরখাস্ত কর্মীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ
এদিকে, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এনবিআর বিভাজনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় বরখাস্ত হওয়া কর্মীদের মধ্যে যোগ্য ও সৎ কর্মীদের চাকরিতে পুনর্বহালের প্রক্রিয়াও চলছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় ইতোমধ্যে অনেকের চাকরি পুনর্বহাল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বাকিদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা
চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দলগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবার বড় এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে।
রাজস্ব বাড়াতে রাজনৈতিক সমর্থন জরুরি
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে মন্দাভাব চলছে। এর ফলে গত অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের পরিচালন ব্যয় এবং নতুন পে-স্কেল সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
অপর সাবেক চেয়ারম্যান মো. নাসির উদ্দিন বলেন, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এ জন্য সরকারের রাজনৈতিক সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিগারেট ও মোবাইল খাতে নজরদারি
নতুন পে-স্কেলের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে সিগারেট ও মোবাইল খাতসহ নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ ও চোরাই মোবাইল বন্ধে আইএমইআই নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে, সিগারেট খাতে শুল্ক ফাঁকি রোধে প্যাকেটে বিশেষ সিকিউরিটি-কিউআর কোড যুক্ত করা এবং কারখানাগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।








