বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে প্যাশন ফল, যা অনেক এলাকায় আনারকলি, ট্যাং ফল বা শরবতি ফল নামেও পরিচিত। তুলনামূলক কম পরিচিত এই ফল চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, বাজারের চাহিদা ও সংরক্ষণ নিয়ে কৃষিবিদদের মধ্যে রয়েছে নানা মত।

কেউ মনে করেন, পর্যটন এলাকাতেই ফলটির চাহিদা বেশি। আবার অনেকে বলছেন, প্যাশন ফলের প্রধান সম্ভাবনা জুস ও শরবত তৈরির শিল্পে। ফলটির আকর্ষণীয় ফুল ও সুগন্ধও অনেকের দৃষ্টি কেড়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, বাংলাদেশের কৃষিতে প্যাশন ফল একটি সম্ভাবনাময় নতুন সংযোজন।

বাংলাদেশে প্রায় দুই দশক আগে প্যাশন ফলের চাষ ও প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষিবিদদের মতে, একবার সঠিকভাবে গাছ রোপণ ও পরিচর্যা করা গেলে দীর্ঘদিন ধরে তা থেকে ফুল ও ফল পাওয়া সম্ভব। তবে ফলটির বাজার এখনো সীমিত হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষের আগে বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

প্যাশন ফলের উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার পার্বত্য অঞ্চলে। পরে এটি আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতেও এর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়।

বাংলাদেশে পর্যটন ও পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে ফলটি পরিচিতি পায়। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড়ের পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্যাশন ফল চাষ হচ্ছে।

ফলটির বাইরের খোসা তুলনামূলক শক্ত হলেও ভেতরে রয়েছে অম্ল-মিষ্ট স্বাদের রস ও বীজ। এর রস, বীজ ও খোসা বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহার করা যায় বলে কৃষি তথ্য সার্ভিস জানিয়েছে। পুষ্টিগুণ ও স্বতন্ত্র স্বাদের কারণে ফলটি খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্পেও সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

সাধারণত ফুল ফোটার ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর প্যাশন ফল সংগ্রহ করা যায়। খোসার রং সবুজ থেকে বেগুনি বা হলুদ হওয়া, সামান্য কুঁচকে যাওয়া এবং গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠা ফল পাকার লক্ষণ। প্রথম বছরে একটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ফল পাওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে ফলের সংখ্যা বেড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি পর্যন্ত হতে পারে বলে কৃষিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বাংলাদেশে প্যাশন ফলের কয়েকটি জাত রয়েছে। এ ফল জুস ও শরবত তৈরির জন্য বিশেষ উপযোগী। তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে ফলটি সম্পর্কে সচেতনতা এখনো কম। লতানো এই গাছ উপযুক্ত পরিচর্যায় দীর্ঘদিন ফল দিতে পারে।

কৃষিবিদদের মতে, প্যাশন ফলের বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা থাকলেও এর বাজার এখনো সীমিত। স্বাদ ও খাওয়ার ধরন প্রচলিত ফলের চেয়ে আলাদা হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে এর চাহিদা তুলনামূলক কম। এ ছাড়া ফলটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তবে জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির শিল্পে ফলটির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু তাজা ফল বিক্রির ওপর নির্ভর না করে প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বাজার গড়ে তুলতে পারলে এর বাণিজ্যিক চাষ আরও লাভজনক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের কৃষক মো. সজল প্যাশন ফল চাষ করে সাফল্য পেয়েছেন। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারে ফলটি দেখার পর তিনি নিজেই চাষের উদ্যোগ নেন। গত বছর ৩৩ শতক জমিতে প্যাশন ফলের চাষ শুরু করেন তিনি।

সজল জানান, জমি প্রস্তুত ও চাষ শুরু করতে তাঁর প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। প্রথম বছরেই ফল বিক্রি করে তিন থেকে চার লাখ টাকা আয় করেছেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর জমি থেকে প্রতি দুই থেকে তিন দিন পর গড়ে এক হাজারটি ফল সংগ্রহ করা যায়। পাইকারেরা প্রতিটি ফল ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে কিনে নেন।

তিনি আরও জানান, প্যাশন ফল শুধু ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত নয়, বছরের অন্যান্য সময়েও পাওয়া যায়। তাঁর এলাকায় এখন আরও অনেক কৃষক এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। অনলাইনের মাধ্যমেও অনেকে তাঁর কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করছেন।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের মতে, প্যাশন ফল দ্রুত পচনশীল হলেও অল্প জমিতে তুলনামূলক বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব। ফলে সঠিক পরিচর্যা, বাজারব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এটি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্যও লাভজনক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।