বাংলাদেশে ২জি মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় যাওয়ার পরিকল্পনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন, স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহার এবং ৪জি ও ৫জি সেবার সম্প্রসারণের জন্য এ উদ্যোগ যৌক্তিক হতে পারে। তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ছয় কোটি ফিচার ফোন ব্যবহারকারীর যোগাযোগ, নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, দেশীয় হ্যান্ডসেট শিল্প এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্ন।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ নতুন ২জি হ্যান্ডসেটের মডেল অনুমোদন বন্ধ, ২০২৭ সালে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে বিধিনিষেধ এবং ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ ২জি সেবা বন্ধের পরিকল্পনার কথা সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে এসব পদক্ষেপের চূড়ান্ত অনুমোদন ও বাস্তবায়নের সময়সীমা নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ফিচার ফোন এখনো দৈনন্দিন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। তাঁদের অনেকেই ফোন ব্যবহার করেন মূলত কল করা ও গ্রহণের জন্য। ফলে স্মার্টফোনে রূপান্তর তাঁদের কাছে শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়, বাড়তি ব্যয়ের বিষয়ও।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ ২জি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ৭০০ থেকে ১,০০০ টাকা। বিপরীতে ৪জি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। অর্থাৎ নতুন প্রযুক্তিতে যেতে একজন গ্রাহককে অতিরিক্ত দেড় থেকে দুই হাজার টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। নিম্নআয়ের পরিবার, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও বয়স্ক মানুষের জন্য এই বাড়তি খরচ বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আগেও কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকা দামে ৪জি ফিচার ফোন বাজারজাত করার চেষ্টা করেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রত্যাশিত চাহিদা না পাওয়ায় কিছু প্রতিষ্ঠান মূল্যছাড় দিয়েও পণ্য বিক্রিতে সমস্যায় পড়ে। এর পেছনে বেশি দাম, অতিরিক্ত সুবিধার সীমিত প্রয়োজন এবং নতুন প্রযুক্তির উপযোগিতা সম্পর্কে গ্রাহকের স্পষ্ট ধারণার অভাব কাজ করতে পারে।
এ ছাড়া শুধু ৪জি সমর্থিত হ্যান্ডসেট থাকলেই ভয়েস কল নিশ্চিত হয় না। হ্যান্ডসেট, সিম, অপারেটরের নেটওয়ার্ক এবং VoLTE সুবিধার সামঞ্জস্যও প্রয়োজন। তাই ২জি ফোনের বিকল্প বাজারে আনলেই গ্রাহক স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা কিনবেন—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
দেশীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদনে ২জি ফোনের ভূমিকা এখনো উল্লেখযোগ্য। BSS-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্থানীয় কারখানায় উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল ২জি ফিচার ফোন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ হার ছিল প্রায় ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ।
বিকল্প পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে ওঠার আগেই ২জি ফোনের উৎপাদন বন্ধ হলে কারখানা, সরবরাহকারী, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা চাপে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে বৈধ ও সাশ্রয়ী ফোনের সরবরাহ কমে গেলে অবৈধ আমদানির সুযোগ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এতে সরকার রাজস্ব হারাতে পারে, বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে পারেন এবং গ্রাহক ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তাই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি দেশীয় শিল্পকে ৪জি ফিচার ফোন ও সাশ্রয়ী স্মার্টফোন উৎপাদনে সক্ষম করে তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।
২জি বন্ধ হলে অপারেটরদের পুরোনো নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমতে পারে এবং ব্যবহৃত স্পেকট্রাম ৪জি ও ৫জি সেবায় কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই পরিবর্তনের সুফল গ্রাহকের কাছেও পৌঁছানো উচিত।
অপারেটররা সাশ্রয়ী ভয়েস প্যাকেজ, কম খরচের কল সুবিধা, হ্যান্ডসেট ও সিমের সমন্বিত প্যাকেজ, সহজ কিস্তিতে ফোন কেনা এবং দ্রুত VoLTE চালুর ব্যবস্থা করতে পারেন। প্রয়োজনে সিম পরিবর্তনের খরচ কমানো বা বিনা মূল্যে সিম বদলের উদ্যোগও নেওয়া যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ৪জি নেটওয়ার্কের মান নিশ্চিত করা। বিভিন্ন এলাকায় কাভারেজ, ইনডোর সিগন্যাল, কল ড্রপ ও ইন্টারনেটের গতি নিয়ে অভিযোগ থাকলে ২জি বন্ধের আগে সেগুলোর সমাধান করতে হবে। অপারেটরভিত্তিক নেটওয়ার্ক, কল সংযোগের সফলতা, VoLTE কার্যকারিতা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেবা স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করা এবং দুর্বলতা পাওয়া গেলে সংশোধনের সময়সীমা নির্ধারণ করা।
সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেটের সরবরাহ বাড়াতে ৪জি ফোনের যন্ত্রাংশে যৌক্তিক শুল্কনীতি, দেশীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং কমদামি ফোনের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন। নিম্নআয়ের গ্রাহকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, সহজ কিস্তি কিংবা স্বল্প সুদে হ্যান্ডসেট কেনার অর্থায়নও বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব সহায়তায় স্বচ্ছ যোগ্যতার মানদণ্ড ও কার্যকর তদারকি থাকা জরুরি।
২জি নেটওয়ার্ক দেশব্যাপী একসঙ্গে বন্ধ না করে পর্যায়ক্রমে এগোনো অধিক বাস্তবসম্মত হবে। প্রথমে এমন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সেবা বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্কের মান যাচাই করে সন্তোষজনক পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় গ্রাহকের কল সংযোগ, জরুরি যোগাযোগ, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা ও বিকল্প ফোনের প্রাপ্যতা মূল্যায়ন করতে হবে। সফল হলে মহানগর, জেলা ও উপজেলা শহর হয়ে শেষ পর্যায়ে গ্রামীণ এলাকায় রূপান্তর করা যেতে পারে। তবে প্রতিটি অপারেটরের নেটওয়ার্কের মান আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২জি থেকে ৪জি-তে রূপান্তর দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্তে অপারেটরদের পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদক, আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা, ভোক্তা অধিকার সংগঠন ও সাধারণ গ্রাহকের মতামত সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা উচিত।
পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল মানুষকে হঠাৎ বাড়তি ব্যয়ের মুখে ফেলা যেমন সমাধান নয়, তেমনি দেশীয় শিল্পকে অনির্দিষ্টকাল পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল রাখাও যুক্তিযুক্ত নয়। প্রয়োজন এমন একটি রোডম্যাপ, যেখানে থাকবে সাশ্রয়ী বিকল্প, নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক, দেশীয় উৎপাদনে সহায়তা এবং গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষার ব্যবস্থা।
শেষ পর্যন্ত ২জি বন্ধের সাফল্য নির্ধারিত হবে কত দ্রুত নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কতজন গ্রাহক সাশ্রয়ীভাবে এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় রেখে নতুন প্রযুক্তিতে যেতে পারলেন, সেটি দিয়েই।









