জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি এবং সেই বিরোধকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে কক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালী এলাকায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী মাহমুদুল্লাহ ও তাঁর পরিবারের অভিযোগ, জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে হলে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দিতে বলা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে জমিতে নির্মাণকাজ করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া পুলিশের উপস্থিতিতে বিরোধ মীমাংসার বৈঠকে জমির বাজারমূল্যের অর্ধেক টাকা অথবা জমির অর্ধেক ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন মাহমুদুল্লাহ। তাঁর দাবি, চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের পরিবারের ওপর তিন দফায় হামলা চালানো হয়েছে। সম্প্রতি তাঁদের চলাচলের রাস্তাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এসব অভিযোগ করেন মাহমুদুল্লাহ। মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ফকিরাঘোনা এলাকার মৌলভী আনছুর আলী পাড়ায় এসব ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় ছাবের মিয়া, মোস্তাক মিয়া ও জসিম উদ্দিনসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এ ঘটনায় জেলা যুবদলের সহসভাপতি মকছুদু আলম নিরু ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) নেজাম উদ্দিনের নামও এসেছে। তবে চাঁদাবাজি বা অভিযুক্তদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিরু।
মাহমুদুল্লাহর দাবি, বিতর্কিত জমিটি তাঁদের কেনা ও খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা সেখানে বসবাস করছেন এবং গাছপালা লাগিয়ে জমি ভোগদখল করছেন। কিন্তু ছাবের ও তাঁর সহযোগীরা ওই জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণসহ কোনো কাজ করতে দিচ্ছেন না। এ নিয়ে কয়েকবার মহেশখালী থানায় অভিযোগও করেছেন তিনি।
মাহমুদুল্লাহর অভিযোগ, থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে বৈঠক হলেও বিরোধের সমাধান হয়নি। বরং জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে বলা হয়। টাকা না দিলে সেখানে কোনোভাবেই ঘর তুলতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে বন্দুক, দা ও কিরিচ নিয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন মাহমুদুল্লাহ। এ ঘটনায় তাঁর বাম হাতের কবজি ভেঙে যায়। তাঁর ৪৮ বছর বয়সী ছোট ভাই রহমত উল্লাহর মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তাঁর কানের পর্দা ফেটে গেছে বলেও দাবি পরিবারের।
হামলায় বাড়িঘর ও বেড়া ভাঙচুর করা হয়েছে এবং এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। পরে পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। আহতদের কয়েকজন গুরুতর অবস্থায় কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
জমির অর্ধেক টাকা, নয়তো অর্ধেক জমি
মাহমুদুল্লাহর অভিযোগ, বিরোধ মীমাংসার কথা বলে জেলা যুবদলের সহসভাপতি মকছুদু আলম নিরুর ব্যক্তিগত সহকারী নেজাম উদ্দিন পুলিশের উপস্থিতিতে জমির বাজারমূল্যের অর্ধেক টাকা অথবা জমির অর্ধেক ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এ কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে নেজাম উদ্দিন বলেন, ছাবের ও তাঁর সহযোগীরা তাঁকে বিরোধ মীমাংসার জন্য টাকার কথা বলতে বলেছিলেন। তাঁদের পক্ষ হয়ে তিনি কথাটি বলেছেন, তবে তাঁর নিজের কোনো দাবি নেই।
মকছুদু আলম নিরু বলেন, তিনি ছাবেরদের হয়ে থানায় যাননি; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর কাছে এসেছিলেন। চাঁদাবাজি বা কাউকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, বিরোধটি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন।
জাল স্ট্যাম্প দেখিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, ছাবের ও তাঁর সহযোগীরা জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি করেছেন এবং এর মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেছেন।
মাহমুদুল্লাহর কাছে জমির মালিকানা দাবি করতে যে স্ট্যাম্প দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ, তাতে আমান উল্লাহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। আমান উল্লাহ বলেন, তাঁর বাবা আবদু রশিদসহ প্রকৃত মালিকদের কাছ থেকে জমি কেনা হয়েছে। তাই ছাবেরদের ওই স্ট্যাম্প দেওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তাঁর দাবি, স্ট্যাম্পটি জাল। বিষয়টি প্রমাণ করতে ছাবেরদের সঙ্গে বসার চেষ্টা করলেও তাঁরা সালিশে উপস্থিত হননি।
অভিযুক্ত ছাবের মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান বলেন, সালিশ বৈঠকে ছাবেরের পক্ষ থেকে বিরোধপূর্ণ জমির বিষয়ে একটি স্ট্যাম্প দেখানো হয়েছিল। অন্যদিকে মাহমুদুল্লাহর কাছে খতিয়ানভুক্ত জমির মালিকানার রেকর্ড রয়েছে। তাঁরা পরস্পরের আত্মীয় হওয়ায় বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল।
ওসি আরও বলেন, এরপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়ে আহতদের উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা এখনো লিখিত অভিযোগ বা এজাহার দেননি। এজাহার পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।









