রংপুর প্রতিনিধিঃ জাহিদুল ইসলাম জসিম 


ধর্ম-বর্ণ, মত ও শ্রেণি-পেশার ভেদাভেদ ভুলে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। এ দেশে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।


মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রংপুর মহানগরের ধর্মসভা এলাকার রাধাগোবিন্দ মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজার মহানবমী উপলক্ষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।


প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় কোনো ধর্মের মানুষকে আলাদা করে দেখা হয়নি। সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছেন। পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও সব সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও সব ধর্ম, মত ও শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল।


হাজার বছর ধরে এ ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি ও সহাবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।


তারেক রহমান বলেন, “আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে সব ধর্ম ও মতের মানুষকে একসঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে হবে।”


তিনি আরও বলেন, “দেশটি আমাদের সবার। এই দেশকে গড়ে তুলতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশটিকে গড়ে তুলতে হলে আমাদের সব বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।”


সরকারের দায়িত্ব ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার শুধু ভোট দেওয়া মানুষের জন্য নয়, যারা ভোট দেননি, তাদের জন্যও কাজ করতে চায়। নির্বাচনে কোনো এলাকায় বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, আবার কোনো এলাকায় হননি। তবে সরকার দল-মত নির্বিশেষে সব এলাকার মানুষের কল্যাণে কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে সব এলাকায় সমানভাবে উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। কোনো অঞ্চল যেন উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে সরকার সচেষ্ট থাকবে।


রংপুরের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নে সম্প্রতি ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে জেলার বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রামে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সেতু-কালভার্ট নির্মাণ, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।


উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের ভেতরে ভেদাভেদ ভুলে থাকতে হবে। একসঙ্গে হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।”


দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, একটি মহল তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বিতর্কিত না করার আহ্বান জানান তিনি।


তারেক রহমান বলেন, কারও কোনো বক্তব্য বা দাবি থাকলে তা জনগণের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদে তুলে ধরা উচিত। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।


দেশের মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা চায় এবং সরকারও সেই লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করছে বলে জানান তিনি।


হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে মহানবমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, মানুষের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।


তিনি বলেন, “আসুন, আমরা আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ার জন্য একসঙ্গে কাজ করি। আমরা আমাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করি, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করি, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করি। সর্বোপরি দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য যেভাবে প্রয়োজন, আমরা সেভাবেই সবাই মিলে কাজ করি।”


তিনি আরও বলেন, “আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যারা আছি, এই বাংলাদেশ আমাদের। এই দেশকে সুন্দর করে আমরা সকলে মিলে পরিশ্রম করে গড়ে তুলব।”


অনুষ্ঠানে রাধাগোবিন্দ মন্দিরের পূজারিরা প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। ছোট শিশুরা নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁকে অভ্যর্থনা জানায়। পরে মন্দিরের সভাপতি ভবতোষ সরকার ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার প্রধানমন্ত্রীর হাতে একটি ক্রেস্ট তুলে দেন।


এ সময় প্রধানমন্ত্রী মন্দির কর্তৃপক্ষের হাতে ১০ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। পাশাপাশি মন্দিরের পেছনে হোস্টেলের মতো অবকাঠামো নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীকে নির্দেশনা দেওয়ার কথা জানান তিনি।


এর আগে মঙ্গলবার বেলা ১২টা ৪ মিনিটে সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে রংপুরের রাধাগোবিন্দ মন্দির প্রাঙ্গণে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা তাঁকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাঁর প্রথম রংপুর সফর।


রংপুরের উদ্দেশে যাওয়ার পথে তারাগঞ্জ ও পাগলাপীর এলাকায় দুটি পথসভায় বক্তব্য দেন তিনি। সেখানেও সব ধর্মের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশ গড়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।


পথসভায় তারেক রহমান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশের মানুষ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড চালু এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।


অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকারসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।