মো নাফীজ আহমেদ 

শিক্ষার্থী, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া 


জন্ম থেকেই নেই দু’হাত। যে বয়সে শিশুরা দু’হাত দিয়ে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে শেখে, খেলতে শেখে, পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে শেখে, সেই বয়সেই হাবিবকে শিখতে হয়েছে, হাত ছাড়াই কীভাবে জীবনকে এগিয়ে নিতে হয়। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা তাঁর পথচলাকে সহজ করেনি; বরং ছোটবেলা থেকেই অন্যদের তুলনায় আলাদাভাবে শিখতে হয়েছে দৈনন্দিন জীবনের নানা কাজ। তবে প্রতিবন্ধকতার কাছে থেমে না গিয়ে নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি। সেই পথচলায় এখন তাঁর পরিচয় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে।


রাজবাড়ী জেলার মৃগী ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিব চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর বাবা একজন কৃষক। সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে বেড়ে ওঠা হাবিবের জীবনে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি ছিল নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে অন্যদের চেয়ে ভিন্নভাবে কাজ করতে শিখতে হয়েছে। এ সময়ে তাঁর মা ছিলেন অন্যতম সহায়। মায়ের সহযোগিতা নিয়ে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলেন তিনি। শৈশবের সেই অভিজ্ঞতাই তাঁকে প্রতিদিনের কাজগুলো নিজের মতো করে সামলে নেওয়ার পথ দেখিয়েছে।


তবে এখন আর সব কাজে অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায় থাকতে হয় না হাবিবকে। নিজের দৈনন্দিন কাজ নিজেই করেন। শৈশব থেকে গড়ে ওঠা এই অভ্যাস তাঁকে আত্মনির্ভর হতে সাহায্য করেছে। অন্যদের মতো একইভাবে কাজ করতে না পারলেও নিজের উপযোগী পদ্ধতিতে কাজ সম্পন্ন করেন তিনি। তাঁর এই পথচলায় পরিবারের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মায়ের সহায়তা তাঁকে ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজ শেখার সুযোগ করে দিয়েছে।


শারীরিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেকে সরে আসেননি হাবিব। বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজে অবদান রাখার স্বপ্নও দেখেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য, পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়া। শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করতে চান তিনি।


নিজের শৈশব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে হাবিব জানান, ছোটবেলা থেকেই তাঁকে অন্যদের চেয়ে আলাদাভাবে সব কাজ করতে শিখতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাঁর মা সব সময় সহযোগিতা করেছেন। এখন তিনি নিজের কাজ নিজেই করেন। ভবিষ্যতে পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষকতা করতে চান তিনি। তাঁর এই লক্ষ্যই উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রেরণা।


হাবিবের স্বপ্ন শিক্ষক হওয়া। এই স্বপ্ন পূরণে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি নিজের চেষ্টা, আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার অভ্যাস এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের জন্য শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে নানা ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে হাবিবের গল্পকে শুধু তাঁর সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ নেই। বরং নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা তিনি করছেন, সেটিই তাঁর পথচলার গুরুত্বপূর্ণ দিক।


একজন শিক্ষার্থী হিসেবে হাবিবেরও রয়েছে নিজের লক্ষ্য পূরণের অধিকার। তাঁর মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং সহযোগিতামূলক মনোভাব তাঁদের শিক্ষাজীবনকে আরও সহজ করতে পারে। কারণ, একজন শিক্ষার্থীর যোগ্যতা ও স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হলে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর অগ্রযাত্রার একমাত্র পরিচয় হয়ে থাকে না।


দুই হাত না থাকলেও স্বপ্ন দেখার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই হাবিবের। শিক্ষক হয়ে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে। তাঁর এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বপ্ন নয়, বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রত্যয়ী গল্প। নিজের কাজ নিজে করা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে হাবিবের জীবন প্রমাণ করে, স্বপ্ন পূরণের পথে শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের গুরুত্ব কখনো কমে যায় না।