চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনার পরও স্বাভাবিক হয়নি ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি। টানা উত্তেজনার মধ্যে বুধবার (১৪ অক্টোবর) ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে এবার অধ্যাপক মুহাম্মদ আরাফাত রহমানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন তাঁরা।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ধর্মঘটও অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অচলাবস্থা বুধবার ২৩তম দিনে গড়িয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার (১২ অক্টোবর)। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রশাসনিক ভবন-২-এর তালা ভেঙে উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও ছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীরা ওই দিন দুপুর ১২টার মধ্যে তাঁকে ক্যাম্পাস ত্যাগের সময়সীমা বেঁধে দেন।

citytouch 728-X-90

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উপাচার্য ক্যাম্পাস না ছাড়ায় তাঁকে এবং আরও ১১ জনকে প্রশাসনিক ভবন-২-এ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। তাঁদের মধ্যে বর্তমান ও সাবেক ছাত্রদল নেতাকর্মীরাও ছিলেন। পরে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের একজন অসুস্থ হয়ে পড়লে ওই রাতে তাঁকে চট্টগ্রামের এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।

প্রায় ৩০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সহায়তায় উপাচার্যসহ অবরুদ্ধ ব্যক্তিরা মুক্ত হন। অসুস্থ উপাচার্যকে পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁকে ২৪ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মেডিকেল বোর্ড তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানাবে।

উপাচার্যকে মুক্তির শর্ত নিয়ে শিক্ষার্থী ও উপাচার্যের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না—এমন শর্তে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে উপাচার্য এ ধরনের কোনো শর্তে মুক্তি পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম মোর্শেদ রাতুল বলেন, মঙ্গলবার শিক্ষার্থীরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, উপাচার্য আর ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবেন না—এই শর্তে তাঁকে মুক্ত করা হচ্ছে। এরপরও তিনি ক্যাম্পাসে ফেরার কথা বললে শিক্ষার্থীরা সে অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন।

অন্যদিকে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম বলেন, তাঁর পদত্যাগ এবং ভবিষ্যতে চুয়েট ক্যাম্পাসে না ফেরার বিষয়ে যে খবর প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। তিনি জানান, তাঁকে যখন ক্যাম্পাস থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন অসুস্থতার কারণে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। এখনো তিনি অসুস্থ এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। সুস্থ হয়ে আবারও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান তিনি।

এদিকে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত একমাত্র শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আরাফাত রহমানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। এর আগে ১১ ও ১২ অক্টোবর উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমের অনুপস্থিতিতে তাঁকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাজে ঢাকায় যাওয়ার কথা জানিয়ে ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে তাঁকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

শিক্ষার্থীদের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভিন্নমত প্রকাশ করা গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের পরিবর্তে ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা উপাচার্য ভবনে চিহ্নিত ও বহিষ্কৃত ব্যক্তিদের প্রবেশে অধ্যাপক মুহাম্মদ আরাফাত রহমানের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এ ধরনের আচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা শিক্ষার্থীরা মেনে নেবেন না।

উপাচার্যকে ঘিরে বিরোধের মধ্যে নতুন করে একজন অধ্যাপককে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করায় চুয়েটের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রশাসনিক সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।