ময়মনসিংহের একটি হাসপাতালে ওয়ার্ডবয় হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন উজ্জ্বল নামের এক তরুণ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি আনম আয়াস নামে পরিচিতি পান। এরপর ময়মনসিংহের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তাঁর নাম আলোচনায় আসতে থাকে। সড়ক অবরোধ, অনশন, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংঘর্ষ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ঘিরে একাধিকবার বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। পরে ঢাকায় এসেও বিতর্ক থেকে রেহাই পাননি। সর্বশেষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আবারও আলোচনায় আসেন আয়াস।

বিভিন্ন নথিতে তাঁর নামের একাধিক রূপ পাওয়া গেছে। কোথাও আ ন ম আয়াস, কোথাও আল নূর মোহাম্মদ আয়াস, আবার কোথাও আল উজ্জ্বল আহমেদ লেখা রয়েছে। এসব নথিতে তাঁর পরিচয়, পেশাগত জীবনের বিভিন্ন পর্যায় এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য উঠে এসেছে।

নথি অনুযায়ী, প্রতারণার একটি মামলায় তাঁর নাম মো. আল-উজ্জ্বল আহমেদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারাগারের নথিতেও আল উজ্জ্বল আহমেদ নামটি রয়েছে। অন্যদিকে, জন্মনিবন্ধনের অনুলিপিতে তাঁর নাম আল নূর মোহাম্মদ আয়াস এবং জন্মতারিখ ১৮ নভেম্বর ২০০৫ উল্লেখ করা হয়েছে।

citytouch 728-X-90

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চেকসংক্রান্ত প্রতারণার একটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতারণার অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।

পুলিশের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়। পরের বছরের এপ্রিলে ওই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে জামিনে মুক্তি পান তিনি।

আয়াস ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার বগিরপাড়া গ্রামের মোস্তফা কামাল ও খোরশেদা খাতুন দম্পতির ছেলে। তিনি ময়মনসিংহ নগরীর চরপাড়া এলাকায় বসবাস করতেন। বর্তমানে তিনি রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সভাপতি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্যসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

৫ আগস্টের পর বিভিন্ন দাবিতে সড়ক অবরোধ, অনশন এবং আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুরের মতো ঘটনায় তাঁর নাম আলোচনায় আসে। এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা হয়।

ময়মনসিংহের কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর শহরে আয়াসকে ঘিরে নানা বিতর্ক তৈরি হয়। তাঁদের দাবি, অল্প কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন এবং কখনো কখনো পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠত। এসব কারণে স্থানীয় মানুষের একাংশ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ।

তারাকান্দার বগিরপাড়া গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, অনেকে ভয়ের কারণে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

ঢাকায়ও একাধিক ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছে। ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নতুন ধারা বাংলাদেশ ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষে আয়াসও মারধরের শিকার হন।

এর আগে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও শহীদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগকে কেন্দ্র করে নতুন ধারা বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট শান্তা ফারজানাকে আয়াস চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির একপর্যায়ে সংঘর্ষ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে মারধর করতে দেখা যায়। একটি ভিডিওতে আয়াসকে মাটিতে পড়ে থাকতে এবং তাঁকে পাইপ দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে তাঁকেও পাল্টা আঘাত করতে দেখা যায়।

পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পরও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা একটি মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়।

এ ছাড়া ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, ভিডিও ধারণ ও খাবার বিতরণকে কেন্দ্র করে তিনজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনাতেও তাঁর নাম আলোচনায় আসে।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরেও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন আয়াস। গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির ফটকে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন বলে জানা গেছে। ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

ময়মনসিংহ নগরীর আলকেমি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, আয়াস ২০১৪ সালে উজ্জ্বল নামে ওয়ার্ডবয় হিসেবে ওই হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় তিন বছর সেখানে কাজ করার পর ২০২৪ সালে নগরীর ইউনিভার্সেল হাসপাতালে এক্সিকিউটিভ পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, ওয়ার্ডবয় থেকে এক্সিকিউটিভ পরিচালক পদে আয়াসের উন্নীত হওয়ার বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর ছিল। তাঁর অতীত সম্পর্কে অনেকেই জানেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আয়াসের বাবা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, তিনি হৃদরোগে ভুগছেন এবং কাজ করতে পারেন না। তাঁর স্ত্রীর মাসিক আট হাজার টাকা বেতনের আয়ে সংসার চলে বলে জানান তিনি। ছেলের গ্রেপ্তারের বিষয়ে মোস্তফা কামালের দাবি, আয়াসকে অযথা গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁকে দ্রুত মুক্তি দেওয়া উচিত।

অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়াসের বিরুদ্ধে চেকসংক্রান্ত প্রতারণার মামলাটি এখনো বিচারাধীন। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হবে আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।