রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে ভারতকে দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ নিয়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কও আরোপ করেছিল তাঁর প্রশাসন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারে চাপ বাড়ার প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ডিজেল আমদানিতে ছাড় দেওয়ার উদ্যোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ওয়াশিংটনের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে।
রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোকে সহায়তা করছে এমন যুক্তিতে ভারতকে রুশ তেল কেনা কমানোর জন্য চাপ দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এখন নিজেদের বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার পথে হাঁটছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের স্বার্থে রুশ জ্বালানি আমদানি গ্রহণযোগ্য হলে ভারতের ক্ষেত্রে একই যুক্তি কেন প্রযোজ্য হবে না? জ্বালানির নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়গুলো কি পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য পূরণে উপেক্ষা করা যায়?
মার্কিন ভোক্তাদের স্বার্থই কি অগ্রাধিকার?
দ্য ইকোনমিক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জ্বালানির বাজারে চাপ এবং ভোটারদের অসন্তোষের আশঙ্কা রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং শীতকালে ঘর গরম রাখার বিভিন্ন ব্যবস্থায় ডিজেল গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এর দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব খাদ্যপণ্যের দামসহ সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে পড়ে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জ্বালানি ব্যয় কমানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ ট্রাম্পের আগের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হতে পারে।
এত দিন যে প্রশাসন রুশ জ্বালানি কেনাকে মস্কোর যুদ্ধের অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে, তারাই এখন নিজেদের বাজারের চাহিদা মেটাতে রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে নমনীয় হওয়ার প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ভারতের যুক্তিও ছিল জ্বালানির নিরাপত্তা
ভারত দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, সরবরাহের নিশ্চয়তা ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। দেশটির প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে সমর্থন না করেও ভারত জ্বালানির নিরাপত্তার স্বার্থে রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। নয়াদিল্লির যুক্তি ছিল, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও ভোক্তাদের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।
এখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে ভারতের সেই যুক্তি নতুন করে গুরুত্ব পেতে পারে। তবে এতে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের অবস্থান পুরোপুরি মেনে নিয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিলেই কি কমবে ডিজেলের দাম?
রাশিয়ার সঙ্গে সরবরাহের সমঝোতা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেলের দাম দ্রুত কমবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি, ইউক্রেনের হামলায় রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চাপ সব মিলিয়ে প্রতিশ্রুত পরিমাণে ডিজেল সরবরাহ করা মস্কোর জন্য সহজ নাও হতে পারে।
এ ছাড়া রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি পৌঁছাতে সময় লাগবে। সরবরাহের পরিমাণ বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় সীমিত হলে বাজারে এর প্রভাবও কম হতে পারে। ফলে আমদানির অনুমতি বা নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া হলেও ডিজেলের দাম দ্রুত কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখানেই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করেও যদি মার্কিন ভোক্তারা উল্লেখযোগ্য স্বস্তি না পান, তাহলে সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ও আইনগত বিরোধিতা আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
রুশ ডিজেল আমদানিতে বাধা হতে পারে মার্কিন কংগ্রেস
রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে মার্কিন কংগ্রেস।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাতজন মার্কিন সিনেটর রাশিয়ার ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট দুই দলের সদস্যই রয়েছেন।
সিনেটরদের যুক্তি, ২০২২ সালে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল পুতিনের যুদ্ধের অর্থায়নে মার্কিন অর্থের প্রবাহ বন্ধ করা। তাঁদের অভিযোগ, নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা করেনি এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যাখ্যাও স্পষ্ট করেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক রাশিয়ার তেল কেনার বিষয়ে ভোটাভুটির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের দাবি, এ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রশাসনের যথেষ্ট আইনি ক্ষমতা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সাময়িক ছাড়ের আওতা ও শর্ত নিয়েও আলোচনা চলছে।
তবে প্রশাসন নিজের সিদ্ধান্তকে আইনসম্মত মনে করলেই যে তা কংগ্রেসের যাচাই-বাছাইয়ে টিকে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনগত ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক সমর্থন দুটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।ভারতের জন্য কি একই ধরনের ছাড় আসবে?
যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে রাশিয়ার ডিজেল আমদানিতে ছাড় কার্যকর করে, তা পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। দ্য ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও ইরানবিষয়ক নিষেধাজ্ঞা আইন আনুষ্ঠানিকভাবে লঙ্ঘন না করে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নিজেদের জ্বালানি আমদানিতে বিশেষ ছাড় দিতে পারে, তা নিয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
তবে ভারতের জন্য আলাদা কোনো ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভারতের স্বার্থ শুধু আমদানি শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার মাধ্যমে দেশটি বিকল্প সরবরাহের উৎস পেয়েছে এবং পরিশোধন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। ওই তেলের একটি অংশ ভারতে পরিশোধনের পর ডিজেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভারতের শোধনাগারে পরিশোধিত কিছু জ্বালানি শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাজারে পৌঁছাতে পারে। ফলে ভারতের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জ্বালানি সরবরাহ ও দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক স্টিফেন মুলের বক্তব্যের বরাতে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারতের হাতেও দর-কষাকষির সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, ভারতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখতে হবে ওয়াশিংটনকে।
এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। বাণিজ্য আলোচনা ও অন্যান্য কূটনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক আগে থেকেই চাপের মুখে থাকলে জ্বালানি ইস্যু সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে।
ট্রাম্প কি নিজের নীতির অসংগতি স্বীকার করবেন?
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানিতে ছাড় দেওয়ার অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প ভারতের সব যুক্তি মেনে নিয়েছেন। তাঁর প্রশাসন এই পদক্ষেপকে সাময়িক, সীমিত এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
জ্বালানির দাম বেশি থাকলে সরবরাহ বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়। আবার বাজার স্থিতিশীল হলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের নীতি বাস্তবে পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের স্বার্থে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি বিবেচনা করা হলে ভারতের ক্ষেত্রেও জ্বালানির নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত কি না।
ভারতের সব নীতির সঙ্গে একমত হওয়া ট্রাম্পের জন্য জরুরি নয়। কিন্তু একই ধরনের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হলে ওয়াশিংটনের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
অন্যদিকে, মার্কিন কংগ্রেসের বিরোধিতা এবং নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত আইনি জটিলতা ভারতের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়ার পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু রাশিয়ার তেল বা ডিজেল কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, নিজের দেশের ভোটারদের স্বার্থে যে অর্থনৈতিক যুক্তি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, অন্য দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে একই যুক্তি মানতে ট্রাম্প কতটা প্রস্তুত। ভারতের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ তাঁর সামনে থাকলেও, সেই শিক্ষা প্রকাশ্যে স্বীকার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।










